একসময় বাঙালি শৈশব মানেই ছিল উঠোন জুড়ে পুতুলের সংসার। মাটির পুতুল, কাপড়ের পুতুল, কাঠের পুতুল—এসব নিয়েই শিশুরা গড়ে তুলত কল্পনার এক রঙিন জগৎ। আজ সেই পুতুল খেলা যেন ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন ওঠে—কেন?
প্রথমত, প্রযুক্তির আগ্রাসন। মোবাইল, ট্যাব, ভিডিও গেম ও কার্টুন চ্যানেল শিশুদের অবসর সময়কে পুরোপুরি গ্রাস করেছে। পর্দার ঝলকানি আর দ্রুত বদলে যাওয়া দৃশ্যের সামনে পুতুলের নীরব উপস্থিতি আকর্ষণ হারাচ্ছে। খেলাধুলোর জায়গায় ঢুকে পড়েছে ভার্চুয়াল বিনোদন।
দ্বিতীয়ত, শহুরে জীবনের পরিবর্তন। একসময় বাড়ির উঠোন, পাড়া বা খোলা মাঠ ছিল শিশুদের খেলার জায়গা। আজ ফ্ল্যাট সংস্কৃতিতে জায়গার অভাব, নিরাপত্তার চিন্তা ও সময়ের সংকট শিশুদের ঘরবন্দি করে রেখেছে। পুতুল খেলায় যে ধৈর্য, সময় ও পরিসর দরকার—তা আজ দুর্লভ।
তৃতীয়ত, অভিভাবকদের দৃষ্টিভঙ্গির বদল। অনেকেই পুতুল খেলাকে “অপ্রয়োজনীয়” বা “সময়ের অপচয়” মনে করেন। পরীক্ষামুখী শিক্ষা, কোচিং আর ফলাফলের চাপে সৃজনশীল খেলাধুলা পিছিয়ে পড়ে। অথচ পুতুল খেলা শিশুর কল্পনা, আবেগ, সামাজিকতা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলে—এ কথা আমরা ভুলে যাচ্ছি।
চতুর্থত, বাজারের প্রভাব। হাতে বানানো পুতুলের জায়গা নিয়েছে দামি, যান্ত্রিক খেলনা—যেগুলো নিজে চলে, কথা বলে, কিন্তু শিশুর কল্পনাকে তেমন জায়গা দেয় না। পুতুল খেলার আসল সৌন্দর্য ছিল শিশুর নিজের গল্প বানানোয়।
তবু আশার কথা আছে। যদি পরিবার ও সমাজ সচেতন হয়, তবে পুতুল খেলা ফিরতে পারে নতুন রূপে। লোকশিল্পের পুতুল, গল্প বলা, নাটক—এসবের সঙ্গে পুতুল খেলাকে জুড়ে দিলে শিশুর শৈশব আবারও হয়ে উঠতে পারে রঙিন, সৃষ্টিশীল ও মানবিক।