ছন্দের যাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত বাঙালির ঘরের কবি। বাঙালির মনের কবি। ‘ইলশে গুড়ি’ বর্ষা, পালকির গান ইত্যাদি কবিতা আজও বাঙালির মনে সঞ্চারিত। তিনি ছিলেন যুগ সচেতন কবি। সত্যেন্দ্রনাথ- এর লেখায় তাঁকে ছন্দের কারুকাজ, শব্দ ও ভাষার অবিশ্বাস্য ব্যবহারের জন্য রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ‘ছন্দের যাদুকর’ নামে অভিহিত করেন। দেশাত্ববোধ, মানবপ্রীতি ছিল তাঁর কবিতার বিষয়বস্তু। তাঁর কবিমানসের অধিষ্ঠাত্রীর দেবী ছিলেন মা সরস্বতী।
সত্যেন্দ্রনাথ উত্তর ২৪ পরগনার নিমতার মামার বাড়িতে জন্মগ্রহন করেন। শুধু কবিতা নয়, নাট্য রচনা, ভারতের ইতিহাস, সংস্কৃত বিষয়ক লেখা, প্রবন্ধ প্রভৃতি রচনাতে তিনি ছিলেন সাবলীল। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সত্যেন্দ্রনাথ ছিলেন উজ্জ্বল ধ্রবনক্ষত্র। ‘কোন দেশেতে তরুলতা/ সকল দেশের চাইতে শ্যামল/ কোন দেশেতে চলতে গেলেই/ দলতে হয় রে দূর্বা কমল...’। এই কবিতা এখনো কান পাতলে কোনো না কোনো শিল্প প্রিয় মানুষ আনন্দে সুর করে বলে দিতে পারবেন। এমনিই জনপ্রিয় ছিলেন কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত।
রবীন্দ্রনাথের প্রিয়পাত্র ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ যখন ‘নোবেল’ পুরস্কার পান, তখন এই সুসংবাদটি সর্বপ্রথম শান্তিনিকেতনে সত্যেন্দ্রনাথই টেলিগ্রাম করে জানান। কবি সত্যেন্দ্রনাথ বিশ্বমানবতার জয়গান গেয়েছেন ‘জাতির পাঁতি’ কবিতায়। ‘জগৎ জুড়িয়া একটি জাতি আছে/ সে জাতির নাম মানুষ জাতি/ এক পৃথিবীর স্তন্যে পালিত একই রবিশশী মোদের সাথি...’। এমন কবিতা, এমন প্রাঞ্জলভাবে আর কে বলতে পারে! তাঁর ‘তীর্থরেণু’, ‘বেনু ও বীনা’, ‘কুহু ও কেকা’, ‘বেলাশেষের গান’, ‘সবিতা’ প্রভৃতি কবিতায় তিনি জাতির কল্যানের কথা বলেছেন।
মানুষ জন্ম হলে একদিন না একদিন তাকে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতেই হবে। ছন্দের যাদুকরও সমস্ত মায়া ত্যাগ করে অনন্তের পথে চলে গেছেন- ১৯২২ সালের ২৫ শে জুন। সত্যেন্দ্রনাথ স্থূলভাবে চলে গেলেন একথা সত্য, কিন্তু সুক্ষভাবে তিনি বাঙালির মনে অমর হয়ে আছেন। তাঁর কবিতার শব্দের বর্ণের কারুকাজ, আজও আমাদের মনে আনন্দ দেয়।