জীবনে কে না ভালো থাকতে চায়? প্রত্যকেই সুখে শান্তিতে জীবন কাটাতে থাকতে চায়! আর ভালো থাকার জন্য আমরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নিরন্তর পরিশ্রম করতে থাকি। কিন্তু এতো কিছুর পরও কি আমরা ভালো থাকতে পারি? কেউ কেউ হয়তো ভালো থাকেন। আবার অনেকেই ভালো থাকেন না। আর জীবনে যখন আমাদের খারাপ সময় যায়, তখন আমরা ভাগ্যের উপর দোষারোপ করে থাকি। জীবনের আগামীদিন গুলি সুন্দর ভাবে গুছিয়ে তোলার জন্য এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য অনেকে জ্যোতিষশাস্ত্রের উপরে বিশ্বাস রেখে জ্যোতিষীদের হাত ধরেন। এখন অনেকের মনে প্রশ্ন আসতেই পারে, জ্যোতিষশাস্ত্র আসলে কী? এর ইতিহাস কী? কিভাবেই বা জ্যোতিষশাস্ত্রের উৎপত্তি?
আমরা সাধারণত জ্যোতিষশাস্ত্র বলতে বুঝি, শিশুর জন্মের সময় গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান, আর এই সব নিয়ে যাঁরা ভাগ্য গণনা করে থাকেন, তাঁদের বলা হয় জ্যোতিষী। কিন্তু জ্যোতিষশাস্ত্র এখানেই সীমিত নয়! এর ইতিহাস বহুদূর বিস্তৃত্ব। আপনি হয়তো জানেন না, জ্যোতিষশাস্ত্র থেকেই সময়, দিন, মাস, বছর, ক্যালেন্ডার, পক্ষ, আমবস্যা, পূর্ণিমা এই সবকিছুর উৎপত্তি। এমনকি ঋতু পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও তা ব্যতিক্রম নয়। বিভিন্ন জায়গা থেকে জানা যায়, জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রাচীনতম প্রমাণ খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতাব্দীতে, যার ক্যালেন্ড্রিক্যাল পদ্ধতি ঋতু পরিবর্তনের পূর্বাভাস দিত এবং ১৭ শতাব্দী পর্যন্ত জ্যোতিষশাস্ত্র পন্ডিত ঐতিহ্য হিসেবে সকলে বিশ্বাস করতেন, এবং সেই শতাব্দীতে জ্যোর্তিবিদ্যা এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল। ১৭ শতাব্দীতে পশ্চিম ইউরোপের কিছু মানুষ পূর্ণ সূর্য দেখে, কিছু পদ্ধতির মাধ্যমে মানুষের ভাগ্য গণনা করে, ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারতেন। পরে, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে এই ভবিষ্যৎ বাণীগুলি নাকি অধিকাংশ ক্ষেত্রে মিলত না। ওই পদ্ধতিগুলি নাকি ভাগ্য গণনার ক্ষেত্রে সঠিক নয়। পরে এই চর্চা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সূর্য, নক্ষত্র এবং চন্দ্রের অবস্থান থেকে ক্যালেন্ডার, এবং ঋতুর পরিবর্তনের সম্বন্ধে ধারনা হতে থাকে। এরপর গ্রহ, চন্দ্র, সূর্য এবং নক্ষত্রের অবস্থান দেখে মানুষের ভবিষ্যৎ বলতে পারতেন কিছু মানুষ এবং যেটা অনেক ক্ষেত্রে মিলে যেত। তারপর আস্তে আস্তে এই জ্যোতিষ চর্চা জনপ্রিয় হতে থাকল। পরে, একে একে সমস্ত দেশেই জ্যোতিষ নিয়ে চর্চা হতে শুরু হল। ভারতেও জ্যোতিষশাস্ত্র নিয়ে কিন্তু যথেষ্ঠ চর্চা আছে। আসুন ভারতের জ্যোতিষশাস্ত্রের ইতিহাসটা জেনে নিই..
ভারতে জ্যোতিষশাস্ত্রের সূচনা বৈদিক যুগে। পাঁচ বছর অন্তর সময়ের চক্রের উপর নির্ভর করে সূর্য ও চাঁদের গতি থেকে সময় এবং তারিখ গণনা শুরু হয়। কিন্তু তা ছিল অনিশ্চিত। মৌর্য বংশেই ভারতীয় জ্যোর্তিবিদ্যা এবং জ্যোতিষশাস্ত্র একসাথেই প্রসার হতে থাকে। ভারতের জ্যোতিষশাস্ত্রের উপর প্রাচীনতম গ্রন্থগুলি বৈদিক যুগেই রচনা করছিলেন ঋষি ভৃগু । ঋষি ভৃগুকে জ্যোতিষশাস্ত্রের জনক বলা হয়। এবং মনে করা হয় তিনিই সপ্তর্ষি বা সাত বৈদিক ঋষির একজন। সাতটি নক্ষত্র মন্ডলের, ‘সাত’টি প্রধান নক্ষত্রের প্রতীক। জ্যোতিষশাস্ত্রের বিভিন্ন ভাগ আছে, যেমন জৈমিনি, নাড়ী, পরাশর, কৃষ্ণমূর্তি পদ্ধতি ইত্যাদি। এই সব পদ্ধতিতে ভাগ্য গণনা করেতেন জ্যোতিষীরা। এছাড়াও শরীরের বিভিন্ন চিহ্ন দেখে ভাগ্য নির্ধারণ করা হয়। হস্তরেখা গণনা এই বিদ্যার একটি শাখা। জ্যোতিষশাস্ত্র মানুষের জীবনে কীভাবে জড়িত? চলুন জেনে নিই...
জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী, ১২ টি রাশি, ১২টি লগ্ন এবং ২৭ টি নক্ষত্র আছে, এবং আছে করণ, যোগ, পায়া, প্রহর ইত্যাদি এই সব নিয়ে তৈরি হয় এক ব্যক্তির জন্মছক। আছে ৯টি গ্রহ, জন্মের সময় চন্দ্র যে রাশিতে থাকে, সেটাই জন্মরাশি এবং জন্মের একটি লগ্ন এবং নক্ষত্র থাকে। এই জন্ম নক্ষত্র থেকে শুরু হয় দশা আর এই দশা থেকেই শুরু হয় অন্তর্দশা। দশা অন্তর্দশার উপর অনেকটা নির্ভর করে ব্যক্তির ভালো থাকাটা।একজন ব্যক্তির জীবনে কখন, কোন সময়ে, কী হবে? এই সমস্তটাই নির্ভর করে দশা আর অন্তর্দশার উপরে। জন্মের সময় চন্দ্র ছাড়া বাকি গ্রহগুলি কেমন ভাবে অবস্থান করছে, তার উপর নির্ভর করেই ব্যক্তির ভাগ্য গণনা করা হয়ে থাকে। ৯ টি রাশির অবস্থান জন্মছকে যদি ভালো বা ইতিবাচক অবস্থায় থাকে, তাহলে ব্যক্তির জীবন ভালোভাবে কাটে কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় জন্ম সূত্রে জন্মছক ভালো হলেও গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান পরিবর্তনে ব্যক্তিকে ভালো ফল দেয় না, বিভিন্ন সমস্যার মুখে পড়তে হয়। তেমন ভাবেই জন্মের সময় গ্রহদের অবস্থান নেতিবাচক থাকলেও, গ্রহের অবস্থান পরিবর্তনের ফলে ভালো ফল দেয়। জন্মের লগ্ন থেকেই বিচার করে ব্যক্তির ভাগ্য গণনা শুরু করা হয়। জ্যোতিষশাস্ত্রের ১২টি রাশির একটি করে অধিপতি থাকে। ৯টি গ্রহ ১২টি রাশিকে পরিচালনা করে। ৯টি গ্রহ হল, সূর্য, চাঁদ, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র, শনি, রাহু এবং কেতু। এই ৯টি গ্রহ, সংখ্যা এবং বাস্তুর সাথে সম্পর্কিত। জ্যোতিষশাস্ত্র বহু যুগ যুগ ধরে চর্চিত হয়ে আসছে। মহাভারতে যেমন কৃষ্ণকে গান্ধারী অভিশাপ দিয়েছিলেন বা কৃষ্ণপুত্র সাম্বকে ঋষি দুর্বাসা অভিশাপ দিয়েছিলেন, এই সমস্তটাই কিন্তু জ্যোতিষশাস্ত্রের সাথেই সম্পর্কিত। আর এই অভিশাপের কারনেই কৃষ্ণ আর কৃষ্ণের সাম্রাজ্য দ্বারকা এবং ত্রেতা যুগের ধ্বংস হয়েছিল। এখন বর্তমানে জ্যোতিষশাস্ত্র এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে যে, বিভিন্ন চ্যানেলে নামকরা জ্যোতিষীরা জ্যোতিষশাস্ত্র নিয়ে প্রায়ই আলোচনা করে থাকেন। যেমন- সুভাষ শাস্ত্রী, কৌশিক ডি কাশ্যপ, অন্যন্যা জোতিষী, বাস্তুবিদ সুস্মিতা প্রমূখ জ্যোতিষীরা CTVN চ্যানেলে ‘আজ কাল পরশু’ অনুষ্ঠানে জ্যোতিষশাস্ত্র নিয়ে বিভিন্ন আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে থাকেন। জন্মছক বিচার করে মানুষের সমস্যার সমাধানের পথ বলে দিয়ে থাকেন। পেশাদার জ্যোতিষীদের দাবি, একটা ব্যক্তির জন্মছক থেকে মানুষের ভবিষ্যৎ বলা সম্ভব। মানুষটির কোথায় সমস্যা, কোন গ্রহ খারাপ অবস্থায় আছে এবং এর ফলে কী কী হতে পারে জীবনে? অথবা যখন কোন গ্রহ ভালো অবস্থায় থাকে সেই সময়ে জীবনে কী ভালো ফল দেবে? ব্যক্তির জন্মছকে কোনো দোষ আছে কিনা? সেই দোষ থেকে ব্যক্তির জীবনে কী সমস্যা হতে পারে? আবার ব্যক্তির জন্মছক বিচার করে বলে দেওয়া যায় ঐ ব্যক্তির বাস্তুতে কোথাও সমস্যা আছে কিনা? এই সব আলোচনার মাধ্যমে বহু মানুষ উপকার পেয়েছেন। বিভিন্ন চ্যানেলের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বহু মানুষ ছোট ছোট উপায়ে নানান সমস্যা থেকে মুক্তি পেয়েছেন।
আবার অনেকে বলে থাকেন, জ্যোতিষশাস্ত্র নাকি মিথ্যা! মানুষকে ভুল বুঝিয়ে টাকা রোজগার করার জন্য ব্যাবসা খুলে বসেছে। কিন্তু সত্যিই কি তাই? এর থেকে তো বহু মানুষ উপকারও পাচ্ছেন। অনেকের বাস্তুতে সমস্যা হলে বিভিন্ন উপায়ের মাধ্যমে বাড়ি না ভেঙেই উপকার পাচ্ছেন। জ্যোতিষশাস্ত্র আসলে কিন্তু বিজ্ঞানসম্মত। আর জ্যোতিষীরা বিজ্ঞান এবং জ্যোতির্বিদ্যা মিলিয়ে মানুষের ভাগ্য গণনা করে থাকেন। এখন অনেকের মনে প্রশ্ন আসতেই পারে, জ্যোতিষশাস্ত্র কি সত্যিই মানব জীবনে প্রভাব ফেলে?
আমরা পৃথিবীর ছাদে বাস করি, পৃথিবী একটি গ্রহ, অর্থাৎ জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী বাকি গ্রহ নক্ষত্রের প্রভাব কিন্তু আমাদের জীবনে পড়ে। আর তার ফলে আপনার জীবনে সমস্যাও আসতে পারে। আপনি হয়তো জানেন না আমাদের জীবনে সবকিছুই জ্যোতিষশাস্ত্রের উপর নির্ভর করে। ধরুন আপনি যে বাড়িতে বাস করছেন সেখানে গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান ঠিক মতো নেই। তখন আপনি কী করবেন? আপনি জানবেন কী করে আপনার সমস্যা কোথায়? আপনার জন্ম রাশি অনুযায়ী আপনার কী গ্রহ দোষ আছে? কিভাবে আপনি আপনার গ্রহদোষ কাটাবেন? কিভাবেই বা সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসবেন? এই সব প্রশ্নের উত্তর জানতে CTVN AKD PLUS চ্যানেলের ‘আজ কাল পরশু’ অনুষ্ঠানে নজর রাখুন।