আপনি কলকাতার নাম শুনেছেন, মুম্বাই, দিল্লী, ব্যাংকক, দুবাই, নিউইয়র্ক, হাতে গুনে শেষ করা যাবে না শহরের সংখ্যা। সেসব শহরে বড় বড় বাড়ি, রাস্তা, বাজার, দোকান, হোটেল, দিন থেকে রাত কোলাহল। কিন্তু একবার ভাবুন যদি একটা গোটা শহরই, আস্ত একটা ১৪তলা বিল্ডিং হয়! অবাক হচ্ছেন তো? প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা যে অঞ্চলে নতুন নতুন রূপ পায়, তার নাম আলাস্কা। বরফে ঢাকা এই রাজ্যের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে আছে অজস্র বিস্ময়। তবে সব বিস্ময়কে ছাপিয়ে গেছে প্রিন্স উইলিয়াম সাউন্ডের উপকূলে অবস্থিত ছোট্ট একটি বন্দর শহর, যার নাম হুইটিয়ার। বাইরে থেকে দেখলে এটিকে আর দশটা সাধারণ পাহাড়ি শহরের মতোই মনে হবে, যেখানে চারপাশ ঘিরে রেখেছে বিশাল হিমবাহ আর নীল জলরাশি। কিন্তু এই শহরের আসল রহস্য লুকিয়ে আছে এর জীবনযাত্রায়। এটি এমন এক শহর, যেখানে পুরো শহরের জনসংখ্যা কোনো আলাদা পাড়া বা মহল্লায় নয়, বরং বসবাস করে মাত্র একটি বহুতল ভবনের ভেতর। আক্ষরিক অর্থেই, পুরো শহরটি টিকে আছে একটি ছাদের নিচে। হুইটিয়ারের এই যান্ত্রিক অথচ অবিশ্বাস্য জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হলো 'বেগিচ টাওয়ার' নামের একটি ১৪ তলা ভবন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন সেনাবাহিনীর তৈরি এই বিশাল কংক্রিটের কাঠামোটি আজ প্রায় তিন শতাধিক মানুষের একমাত্র আশ্রয়স্থল। বাইরে যখন মাইনাস ডিগ্রি তাপমাত্রা আর তীব্র তুষারঝড়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন এই ভবনের ভেতরে গড়ে ওঠে এক স্বয়ংসম্পূর্ণ জগৎ। এখানকার বাসিন্দাদের বাজার করা, চিঠি পাঠানো কিংবা চিকিৎসার জন্য ঘরের বাইরে কোনো কনকনে ঠান্ডার রাস্তায় পা রাখার প্রয়োজন হয় না। ভবনের ভেতরেই রয়েছে একটি ছোট সুপারমার্কেট, লন্ড্রি, পোস্ট অফিস, চিকিৎসাকেন্দ্র, গির্জা এমনকি শহরের প্রশাসনিক কাজের জন্য মেয়র ও পুলিশের কার্যালয়। বাসিন্দারা ঘরের আরামদায়ক পোশাক পরেই লিফটে চেপে এক তলা থেকে অন্য তলায় গিয়ে তাদের দৈনন্দিন সব কাজ সেরে নিতে পারেন। এমনকি ভবনের বেসমেন্ট দিয়ে তৈরি একটি সুড়ঙ্গ পথ সরাসরি যুক্ত হয়েছে পাশের স্কুলের সাথে, যাতে তীব্র শীতেও শিশুদের খোলা আকাশের নিচে বের হতে না হয়।
হুইটিয়ারের এই অদ্ভুত ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং জীবনযাত্রার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে এখানকার চরম প্রতিকূল আবহাওয়া। শীতকালে এখানে মাইলের পর মাইল বরফের স্তর জমে যায় এবং বাতাসের গতিবেগ এতটাই বেশি থাকে যে বাইরে বের হওয়া জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। এই প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতার কারণেই এক সময়ের সামরিক ব্যারাকটি আজ একটি শহরের রূপ নিয়েছে। এখানকার মানুষজন একে অপরকে খুব ঘনিষ্ঠভাবে চেনেন, যা আধুনিক শহরের ব্যস্ততার মাঝে এক বিরল মানবিক বন্ধন তৈরি করেছে। বাইরের পৃথিবীর সাথে এই শহরের যোগাযোগের মাধ্যমটিও বেশ রোমাঞ্চকর। হুইটিয়ারে সড়কপথে প্রবেশ করার একমাত্র উপায় হলো প্রায় আড়াই মাইল দীর্ঘ একটি সরু সুড়ঙ্গ, যা অ্যান্টন অ্যান্ডারসন মেমোরিয়াল টানেল নামে পরিচিত। পাহাড় কেটে তৈরি এই সুড়ঙ্গটি এতটাই সংকীর্ণ যে একই সাথে দুদিক থেকে গাড়ি চলাচল করতে পারে না। নির্দিষ্ট সময় পর পর দিক পরিবর্তন করে একবার একদিকের গাড়ি পার করা হয়, যার মধ্যে ট্রেনের লাইনও অন্তর্ভুক্ত। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, রাতের একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর এই সুড়ঙ্গের মূল ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়। তখন গভীর রাত থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত হুইটিয়ার পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে মূল ভূখণ্ড থেকে।
গ্রীষ্মকালে অবশ্য এই শহরের রূপ বদলে যায়। তখন বরফ গলে চারপাশের প্রকৃতি সেজে ওঠে সবুজ আর নীলের মায়াবী কম্বিনেশনে। সুড়ঙ্গ পেরিয়ে কিংবা জলপথে অসংখ্য পর্যটক ছুটে আসেন এই অদ্ভুত শহরের জীবন নিজের চোখে দেখতে। কেউ আসেন ক্রুজ শিপে চেপে তিমি দেখতে, কেউ আসেন হিমবাহের সৌন্দর্য উপভোগ করতে। তবে পর্যটকদের মূল আকর্ষণ থাকে ওই ১৪ তলা ভবনটিই। বছরের মাত্র কয়েকটা মাস বাইরের মানুষের কোলাহলে মুখরিত থাকলেও, বছরের বাকিটা সময় হুইটিয়ার ফিরে যায় তার চেনা ছন্দে। প্রকৃতির রুক্ষতার সাথে লড়াই করে টিকে থাকার এক অনন্য উদাহরণ এই শহর, যেখানে এক চিলতে ছাদই একটা আস্ত শহর হয়ে উঠেছে।