ঝকঝকে বহুতল ভবন, নিয়ন আলোর ঝলকানি, বিলাসবহুল শপিং মল আর কোটিপতিদের স্বর্গরাজ্য— হংকং বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এশিয়ার অন্যতম ধনী এই অর্থনৈতিক কেন্দ্রের ঝা চকচকে এক ছবি। কিন্তু এই চোখধাঁধানো জাঁকজমকের ঠিক পেছনেই লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার, দমবন্ধ করা বাস্তব। যেখানে হাজার হাজার মানুষ বেঁচে থাকার ন্যূনতম মানবিক অধিকারটুকু হারিয়ে, যাপন করছেন এক পৈশাচিক জীবন। হংকংয়ের আকাশচুম্বী আবাসন সংকটের সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও কুখ্যাত বহিঃপ্রকাশ হলো এখানকার ‘কফিন হোম’ বা কফিন ঘর। নামটা শুনলেই যেমন গা শিউরে ওঠে, এর ভেতরের বাস্তবচিত্র তার চেয়েও অনেক বেশি ভয়ানক। এটি কোনো রূপক অর্থ নয়, আক্ষরিক অর্থেই মৃত্যুর পর মানুষকে যে আকারের কফিনে শোয়ানো হয়, ঠিক ততটুকু জায়গাজুড়েই গড়ে উঠেছে জীবন্ত মানুষের একেকটি সংসার।
একটি সাধারণ ফ্ল্যাট বা ঘরকে কাঠ বা প্লাইউডের ছোট ছোট তক্তা দিয়ে আড়াআড়ি ও লম্বালম্বিভাবে ভাগ করে তৈরি করা হয় এই কফিন হোমগুলো। সাধারণত মাত্র ১৫ থেকে ২০ বর্গফুটের একেকটি বাক্সসদৃশ খুপরিতে বছরের পর বছর কাটিয়ে দিচ্ছেন একেকজন মানুষ। এই ঘরের পরিমাপ এতটাই সংকীর্ণ, যে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ সেখানে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না, এমনকি দুই হাত দুই দিকে পুরোপুরি প্রসারিত করার মতো জায়গাও থাকে না। ঘুমানোর সময় পা দুটো পুরোপুরি সোজা করাও অনেকের জন্য এক বিলাসী স্বপ্ন। এই এক চিলতে জায়গার মধ্যেই একজন বাসিন্দাকে ঠাসাঠাসি করে রাখতে হয় তার জামাকাপড়, হাঁড়ি-পাতিল, টেলিভিশন, ওষুধপত্রসহ জীবনের যাবতীয় তৈজসপত্র। যেখানে ঘরের দেয়াল আর ছাদ মাথার ঠিক কয়েক ইঞ্চি ওপরে এসে থমকে দাঁড়ায়, সেখানে প্রতিদিনের জীবন কাটানো কোনো বন্দিশালার চেয়ে কম নয়। কখনও সেখানে বাধ্য হয়ে দুজনকেও থাকতে হয়।
কফিন হোমগুলোর ভেতরের পরিবেশ অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। একটি বড় ফ্ল্যাটে যেখানে হয়তো চার-পাঁচজন মানুষের থাকার কথা, সেখানে এই কফিন ব্যবস্থার কারণে একসাথে প্রায় কুড়ি থেকে ত্রিশজন মানুষকে থাকতে হয়। আর এই বিশাল সংখ্যক মানুষের জন্য পুরো ফ্ল্যাটে থাকে মাত্র একটি বা দুটি সাধারণ বাথরুম। ফলে সকালের দিকে টয়লেট ব্যবহারের জন্য বাসিন্দাদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, জায়গার চরম সংকটের কারণে অনেকের কফিন হোমের ভেতরেই, শোবার তোশকের ঠিক কয়েক ইঞ্চি দূরেই বসানো থাকে রান্নার ছোট্ট ইলেকট্রিক স্টোভ বা রাইস কুকার। একই জায়গায় রান্না, খাওয়া, ঘুমানো এবং টয়লেটের গন্ধ— সব মিলিয়ে ঘরের ভেতরের বাতাস সবসময় ভারী ও দুর্গন্ধময় হয়ে থাকে। বাতাস চলাচলের জন্য কোনো জানালা না থাকায় গরমের দিনে এই খুপরিগুলো একেকটি জীবন্ত চুল্লিতে পরিণত হয়, যেখানে ছারপোকা, ইঁদুর আর তেলাপোকার সাথে যুদ্ধ করে বাসিন্দাদের ঘুমাতে হয়।
এই নরকতুল্য পরিস্থিতিতে কারা বাস করেন, সেই প্রশ্ন আসাটা স্বাভাবিক। কফিন হোমের বাসিন্দাদের সিংহভাগই সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষ, যাদের মধ্যে রয়েছেন বয়োবৃদ্ধ একা থাকা মানুষ, দিনমজুর, রেস্তোরাঁর পরিচ্ছন্নতাকর্মী, কম বেতনের চাকরিজীবী এবং কখনো কখনো ভাগ্যহীন তরুণ বেকাররা। হংকং পৃথিবীর অন্যতম ব্যয়বহুল শহর হওয়ায় এখানে সাধারণ একটি ফ্ল্যাটের ভাড়া আকাশচুম্বী। সাধারণ মানুষের আয়ের সিংহভাগ দিয়েও একটি ভালো ঘর ভাড়া নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে পেটের তাগিদে এবং মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে তারা তাদের আয়ের একটি বড় অংশ বাজি ধরেন এই কফিন হোমের পেছনে। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রতি বর্গফুটের হিসাব করলে হংকংয়ের বিলাসবহুল প্রাসাদের চেয়ে এই কফিন হোমগুলোর ভাড়ার হার অনেক সময় বেশি হয়ে দাঁড়ায়, যা গরিব মানুষের ওপর এক নির্মম শোষণের শামিল।
এখানে বসবাসকারী মানুষের মানসিক অবস্থা আরও করুণ। বছরের পর বছর আলো-বাতাসহীন এমন একটা খাঁচায় বন্দি থাকতে থাকতে অনেকেই তীব্র মানসিক অবসাদ ও বিষণ্নতায় ভোগেন। নিজের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা ‘প্রাইভেসি’ বলতে এখানে কিছুই নেই। পাশের খুপরির মানুষের ফিসফিসানি, কাশির শব্দ বা কান্নার আওয়াজ দেয়াল ভেদ করে চলে আসে অনায়াসে। ফলে একাকীত্ব দূর হলেও এক ধরণের মানসিক অবরুদ্ধতা গ্রাস করে সবাইকে। তাস খেলা, মোবাইল স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকা কিংবা কেবলই সিলিংয়ের দিকে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া এখানকার বাসিন্দাদের আর কোনো বিনোদন নেই। বাইরে থেকে আসা পর্যটকদের কাছে এটি একটি কৌতূহল বা রহস্যের বিষয় হতে পারে, কিন্তু এখানকার বাসিন্দাদের কাছে এটি প্রতিদিনের বেঁচে থাকার এক নির্মম নিষ্ঠুর লড়াই। হংকংয়ের এই কফিন হোমগুলো প্রমাণ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন আর বহুতল ভবনের জৌলুসের আড়ালে কীভাবে মানবিকতার আলো ঢাকা পড়ে যেতে পারে।