সনাতন ধর্মে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শুধু একজন দেবতা নন, তিনি ভক্তের হৃদয়ের চিরন্তন সঙ্গী। ভক্তি মানে কেবল মন্ত্র জপ নয়, ভক্তি মানে প্রেম, সমর্পণ ও ঈশ্বরের সঙ্গে জীবনের সব আনন্দ-বেদনা ভাগ করে নেওয়া। শাস্ত্র ও পুরাণে অসংখ্য ভক্তিমূলক কাহিনি আছে, যেখানে দেখা যায় কীভাবে ভগবান কৃষ্ণ ভক্তদের ডাকে সাড়া দিয়েছেন, কখনো গোপাল হয়ে, কখনো সারথি হয়ে, আবার কখনো সাধারণ বন্ধুর মতো।
আজ আমরা সেইরকম কিছু অজানা অথচ হৃদয়স্পর্শী কৃষ্ণ–ভক্তির কাহিনি শুনব-
১. বিদুরের কলাপাতার ভোজন
মহাভারতের বিদুর ছিলেন এক অতি ভক্তিশ্রেষ্ঠ। তিনি ছিলেন রাজদরবারের মন্ত্রী, কিন্তু তাঁর ভক্তি ছিল অগাধ। যখন শ্রীকৃষ্ণ হস্তিনাপুরে দূত হয়ে এলেন, দুর্যোধন তাঁকে সোনার আসন ও অগাধ ভোজনে আপ্যায়িত করতে চাইলেন। কিন্তু কৃষ্ণ সেখানে যাননি। তিনি সরাসরি চলে গেলেন বিদুরের সাধারণ কুটিরে।
বিদুর এবং তাঁর পত্নী স্নেহভরে ভগবানকে কলাপাতায় ভাত-ডাল পরিবেশন করলেন। তাঁদের প্রেম ও ভক্তি এতই নির্মল ছিল যে কৃষ্ণ বললেন- 'বিদুর, তোমার এই একমুঠো ভাত আমার কাছে স্বর্গীয় অমৃতের থেকেও শ্রেষ্ঠ।'
এই কাহিনি প্রমাণ করে, ভগবানকে সোনার আসনে নয়, ভক্তির আসনে বেঁধে রাখা যায়।
২. দ্রৌপদীর চিৎকার ও কৃষ্ণরক্ষা
কুরুসভায় যখন দুর্যোধন দ্রৌপদীকে অপমান করতে চাইছিল, তখন তিনি কাঁপতে কাঁপতে কৃষ্ণকে ডাকলেন। প্রথমে তিনি নিজের শক্তি দিয়ে আঁচল টানতে লাগলেন, কিন্তু যখন সব শেষ হয়ে গেল, তখন সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে চিৎকার করলেন- 'হে কৃষ্ণ, রক্ষা করো!'
সেই মুহূর্তে কৃষ্ণ অসীম বস্ত্র রচনা করে দ্রৌপদীর লজ্জা রক্ষা করলেন। এই কাহিনি আমাদের শেখায়- সত্যিকারের ভক্তি মানে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ, যেখানে ভগবানকে ছাড়া আর কোনো ভরসা থাকে না।
৩. মীরাবাঈর প্রেমভক্তি
রাজপুত পরিবারের রাজকুমারী হয়েও মীরাবাঈ কৃষ্ণকে স্বামী রূপে মানতেন। তাঁর ভজন, তাঁর গান, তাঁর চোখের অশ্রুতে কৃষ্ণ যেন জীবন্ত হয়ে উঠতেন।
যখন তাঁর পরিবার তাঁকে কৃষ্ণভক্তি থেকে বিরত করতে নানা কষ্ট দিল- এমনকি তাঁকে বিষের পাত্রও দেওয়া হয়েছিল, তখনও মীরা নির্ভীকভাবে কৃষ্ণের নাম জপ করে সেই বিষ পান করেছিলেন। আশ্চর্যের বিষয়, সেই বিষ রূপান্তরিত হয় অমৃতে।
মীরার জীবনের এই ভক্তি প্রমাণ করে, যেখানে সত্যিকারের প্রেম আছে, সেখানে কৃষ্ণ স্বয়ং উপস্থিত।
৪. সুধামার তৃণভক্তি
সুধামা ছিলেন কৃষ্ণের বাল্যবন্ধু। তিনি ছিলেন অতি দরিদ্র ব্রাহ্মণ। একদিন স্ত্রী অনুরোধ করলেন কৃষ্ণের কাছে সাহায্য চাইতে। সুধামা লজ্জায় কিছু দিতে না পেরে মাত্র একমুঠো চিড়া সঙ্গে নিয়ে দ্বারকায় গেলেন।
কৃষ্ণ তাঁকে দেখে চোখে জল নিয়ে বন্ধুকে বুকে টেনে নিলেন। বন্ধুর আনা সেই শুকনো চিড়া এত ভালোবাসায় খেলেন যে, সুধামার ভাঙা কুটির অমনি স্বর্গীয় প্রাসাদে রূপান্তরিত হয়ে গেল।
৫. গোপীদের ভক্তি
বৃন্দাবনের গোপীরা কৃষ্ণভক্তির সর্বোচ্চ রূপ। তাঁরা কৃষ্ণকে শুধু দেবতা নয়, নিজেদের প্রাণপ্রিয় সখা ও প্রভু হিসেবে মানতেন। কৃষ্ণ যখন বংশী বাজাতেন, তখন সব কাজ ফেলে তাঁরা তাঁর কাছে ছুটে যেতেন।
শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণে বলা হয়েছে- 'গোপীদের ভক্তি ছিল সর্বোচ্চ, কারণ তাঁরা কিছু পাওয়ার জন্য কৃষ্ণকে ভালোবাসেননি, তাঁরা শুধু কৃষ্ণকে কৃষ্ণ বলে ভালোবেসেছেন।'
৬. অন্ধ ভক্ত সুরদাস
সুরদাস জন্মান্ধ ছিলেন। চোখে আলোর দেখা পাননি, কিন্তু হৃদয়ে কৃষ্ণের আলোই তাঁর দৃষ্টি ছিল। তিনি গান রচনা করতেন, যেখানে কৃষ্ণ ছিলেন তাঁর জীবনের প্রতিটি স্পন্দন।
একবার কেউ তাঁকে কটাক্ষ করে বলল- 'তুমি তো কৃষ্ণকে চোখে দেখোনি, তবে এত ভালোবাসা কোথা থেকে আসে?'
সুরদাস মৃদু হেসে বললেন- 'চোখের দেখা অনেক সময় ভ্রম, হৃদয়ের দেখা-ই আসল সত্য। আমি অন্তরে কৃষ্ণকে দেখেছি।'