Calcutta Television Network

মেঘে ঢাকা জঙ্গলে মিলল নয়া প্রজাতির বন্য বিড়াল

মেঘে ঢাকা জঙ্গলে মিলল নয়া প্রজাতির বন্য বিড়াল
22 September 2026 04:17:31 pm

ছোট্ট মতো মুখ, কুট্টি কুট্টি কান, বুকের ভেতরে গরগরানি শব্দ, থাবার তলাটা গোলাপি, গায়ে ছোপ ছোপ দাগ। দেখতে আদুরে হলেও এটি আসলে একটি বন্য প্রাণী। দীর্ঘ প্রায় এক শতাব্দী পর বিজ্ঞানীদের নজরে অপরিচিত মুখের এই বন্য প্রাণীটি। আদতে এটি বন্য বিড়ালেরই এক বিরল প্রজাতি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর এমন আবিষ্কার প্রাণীজগতের গবেষণায় আলোড়ন ছড়িয়েছে।

মেঘে ঢাকা আন্দিজের জঙ্গলে এতদিন নিঃশব্দেই ঘুরে বেড়িয়েছে প্রাণীটি। চোখের আড়ালে থাকা ছোট্ট বন্য বিড়ালটির বৈজ্ঞানিক নাম Leopardus tilcayo। স্থানীয়দের কাছে অবশ্য সে পরিচিত ‘টিলকায়ো’ নামে। বলিভিয়ার Yungas অঞ্চলের ঘন অরণ্যে প্রাণীটির দেখা মিলেছে। আন্দিজ পর্বতমালা ও আমাজ়ন অববাহিকার মাঝামাঝি এই ভূখণ্ডে বছরের বেশির ভাগ সময়ই জঙ্গলের উপর নেমে থাকে ঘন মেঘের চাদর। সেই কুয়াশা-মেঘে ঢাকা দুর্গম অরণ্যই এতদিন আশ্রয় দিয়ে এসেছে এই অচেনা ছোট্ট শিকারিকে।

আকারে প্রাণীটি পরিচিত বিড়ালের চেয়ে অনেকটাই ছোট। মাত্র ৪৫ থেকে ৪৬ সেন্টিমিটার লম্বা এই বন্য বিড়ালের ওজনও ১.৩ থেকে ১.৪ কিলোগ্রামের মধ্যে। শরীরজুড়ে হালকা বাদামি লোমের উপর ছড়িয়ে রয়েছে গাঢ় ছোপের নকশা, যা তার চেহারায় এনে দিয়েছে একপ্রকার বুনো সৌন্দর্য।

টিলকায়োর গল্পটা অবশ্য বিজ্ঞানীদের জঙ্গলে খোঁজার মধ্য দিয়ে শুরু হয়নি। এক স্থানীয় বাসিন্দার হাত ধরেই প্রথম গবেষকদের নজরে আসে এই অচেনা প্রাণী। একদিন একটি ছোট বিড়ালছানাকে বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন তিনি। সাধারণ পোষ্য বিড়াল ভেবেই তার যত্নও চলছিল। পরে বোঝা যায়, এটি আদতে গৃহপালিত নয়, বন্য প্রাণী। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় Senda Verde নামের একটি বন্যপ্রাণী আশ্রয়কেন্দ্রে।

সেখানেই বিড়াল ছানাটিকে দেখে থমকে যান গবেষক Paola Nogales-Ascarrunz। এক নজরে প্রাণীটিকে টাইগার ক্যাট হিসেবেই মনে করা হয়েছিল কিন্তু একটু খুঁটিয়ে দেখতেই নজরে এসেছিলো বেশ কিছু অমিল। বিড়ালটির শরীরে ছোপ গুলির বিন্যাস এবং লেজের গঠন টাইগার ক্যাট-এর থেকে অনেকটাই আলাদা। কার্যত সেই কারণেই সন্দেহ দানা বাধে গবেষকদের মনে । সন্দেহ থেকেই শুরু হয় পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষার ফলই ধীরে ধীরে খুলে দেয় এক অজানা অধ্যায়ের দরজা।

জিনগত পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখেন গবেষকেরা। সেই তালিকায় ছিল জীবিত প্রাণী, উদ্ধার করা প্রাণীর নমুনা এবং বিভিন্ন মিউজ়িয়ামে সংরক্ষিত নমুনাও। ফলাফলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, টিলকায়োর সঙ্গে পরিচিত Tiger Cat-দের জিনগত পার্থক্য রয়েছে। গবেষণার অনুমান, প্রায় ১৪ লক্ষ বছর আগেই এই প্রাণীর পূর্বপুরুষেরা অন্য Tiger Cat-দের থেকে আলাদা পথে বিবর্তিত হয়েছিল।

সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়টি হলো যে প্রাণীটিকে বর্তমানে নতুন করে চিনেছেন গবেষকেরা তা সেখানকার স্থানীয়দের কাছে পরিচিত একটি মুখ। বলিভিয়ার স্থানীয় সম্প্রদায় বহুদিন ধরেই এই ছোট বন্য বিড়ালকে ‘টিলকায়ো’ নামে চেনেন। তাই নতুন কোনও নাম দেওয়ার পথে হাঁটেননি গবেষকেরা। স্থানীয় মানুষের মুখে প্রচলিত নামটিই রাখা হয়েছে তার বৈজ্ঞানিক পরিচয়ের সঙ্গে।

অর্থাৎ বিজ্ঞানের খাতায় টিলকায়ো নতুন হলেও, স্থানীয় মানুষের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতায় সে বহু পুরনো পরিচিত। আর এই আবিষ্কার যেন সেই পরিচিত প্রাণীটির অস্তিত্বকেই নতুন করে বিশ্বের সামনে তুলে ধরল।

তবে টিলকায়োকে ঘিরে রহস্য এখনও কাটেনি। জঙ্গলে এই প্রজাতির মোট সংখ্যা কত, তাদের বিচরণক্ষেত্র কোথায়, কী ধরনের খাবার তারা পছন্দ করে কিংবা কী ভাবে জীবনযাপন করে এখনও তার স্পষ্ট উত্তর নেই। গবেষকদের অনুমান, প্রাণীটি নিশাচর হতে পারে এবং ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী তার খাদ্যতালিকায় থাকতে পারে। ফলে টিলকায়োর জীবনযাপন সম্পর্কে আরও তথ্য জানতে ভবিষ্যতে প্রয়োজন হবে দীর্ঘ গবেষণা।

×
  • CTVN