দেশের প্রধান বিচারপতি একটি মন্তব্য করেছিলেন নিজের এজলাসে বসে। এবং, সেই মন্তব্যের মাধ্যমে কার্যত বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, যাদের কোনও কাজকর্ম নেই, তথ্যের অধিকার আইনে তারা কথায়-কথায় এখানে-সেখানে চিঠি পাঠায়। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এইটুকু বলেই থামেননি। তাঁর সংযোজন, যারা এইসব কাজ করে যায়, তারা সমাজের আরশোলা (যদিও তাঁর মন্তব্য বিকৃত করা হয়েছে বলে দাবি করেন প্রধান বিচারপতি)।
প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় পথ চলা শুরু করে ককরোচ পার্টি। প্রথমে সমাজমাধ্যমে, ভার্চুয়ালি। পরে, সরাসরি সশরীরে রাজপথে।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ডাক্তারির সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা নিট-এর প্রশ্ন ফাঁস কিন্তু নতুন কিছু নয়। এর আগেও হয়েছে। কিন্তু, নিটের প্রশ্ন-ফাঁস যেহেতু মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকের প্রশ্ন ফাঁসের চেয়ে অনেক বেশি গুরুতর, তাই যুব সমাজের মধ্যে ক্ষোভ জমছিল। বলা ভালো. যুব সমাজের যে-অংশ তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছল, কয়েক লক্ষ টাকা দিয়ে প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারে, সেই অংশই কিন্তু ভিতরে-ভিতরে ক্ষুব্ধ হচ্ছিল। এমনকি, ককরোচ পার্টির স্রষ্টা অভিজিৎ দীপকেও কিন্তু বিদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। যুব সমাজের যে-অংশ অগ্নিবীর নিয়ে আন্দোলন করে, সেই অংশকে কিন্তু যন্তরমন্তরে দেখা যায়নি। সেনাবাহিনীতে স্থায়ী পদের পরিবর্তে চু্ক্তিভিক্তিক অগ্নিবীর নিয়ে প্রতিবাদে নেমেছিল নিম্ন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত। আর্থিকভাবে স্বচ্ছল পরিবারের ছেলেমেয়েরা কিন্তু কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করে ব্র্যান্ডেড কোচিং সেন্টারে গিয়ে কেরিয়ারের কথা ভাবে। ককরোচ-স্রষ্টা অভিজিৎ সেই তাদেরই প্রতিনিধি।
পর্যবেক্ষকরা কেউ কেউ মনে করাচ্ছেন, ইউপিএ-২ সরকারের আমলে আকাশ থেকে উদিত হয়েছিলেন জনৈক আন্না হাজারে। লোকপালের দাবিতে অনশন শুরু করেছিলেন তিনি। দুর্নীতিমুক্ত ভারত গড়ার লক্ষ্যে হাজারে-র অনশন মঞ্চে হাজারো মানুষ ভিড় করেছিল। এবং, সেই হাজারো মানুষের অন্যতম একজন ছিলেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল। বাকিটা ইতিহাস।
কেজরিওয়ালও কিন্তু আইআইটি পাশ। সমাজের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধি। বলা ভালো, মেধাবী ছাত্রদের প্রতিনিধি। মাঠে-ময়দানে রাজনীতি করে উঠে আসেননি তিনি। তবু, তাঁর আমজনতা পার্টি দিল্লি জয় করে এবং তিনি দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী হন।
অভিজিৎ দীপকেও কিন্তু এই ধরনের জল্পানার জন্ম দিচ্ছেন। প্রথমে ককরোচ পার্টি, শিক্ষিত যুব সম্প্রদায়, মার্জিত আন্দোলন। কিন্তু পরে, শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মই বেয়ে কি রাজনীতির মঞ্চে?
সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না একেবারেই। আন্দোলনে নেমে জয় ছিনিয়ে এনে অভিজিৎ এখন বলছেন, অনেক পথ চলা বাকি। ঠিকই। কিন্তু, সে পথকি কেজরিওয়ালের পথ? নাকি, সত্তরদশকের জয়প্রকাশ নারায়ণের পথ?
এখনই বলা কঠিন। তবে, একুটু বলা যেতেই পারে, নাগরিক সমাজের মধ্যে যাঁরা বিজেপির বিরুদ্ধে আঞ্চলিক দলগুলোকে বিকল্প হিসেবে ভাবতে পারেন না, তাঁদের কাছে কিন্তু বিকল্প হয়ে উঠতে পারে ককরোচ পার্টি।
প্রসঙ্গত, ককরোচ আন্দোলনেও কিন্তু একজন অনশনকারী ছিলেন এবং,
অ-রাজনৈতিক বলে কিছু হয় না। মনে করছে রাজধানীর রাজনৈতিক মহল। সরকার বিরোধী হাওয়াকে কাজে লাগিয়ে প্রথমে স্বচ্ছ ও শিক্ষিত গণ আন্দোলন। পরে, সরাসরি রাজনীতির ময়দান। এমন দৃষ্টান্ত কিন্তু একাধিকবার দেখেছে ইন্দ্রপ্রস্থ।