মণি ভট্টাচার্য: 'সাংবাদিকরা আমাদের অ্যাসেট,' কোনও মুখ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করেন, এর থেকে শান্তির একজন সাংবাদিকের কাছে কিছুই হতে পারেনা, লিখছি রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্...
মণি ভট্টাচার্য: 'সাংবাদিকরা আমাদের অ্যাসেট,' কোনও মুখ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করেন, এর থেকে শান্তির একজন সাংবাদিকের কাছে কিছুই হতে পারেনা, লিখছি রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ও পরিস্থিতির কথা। গণতন্ত্রের চারটি স্তম্ভের অন্যতম সংবাদমাধ্যম। রাষ্ট্র, প্রশাসন ও রাজনৈতিক ক্ষমতার উপর নজরদারি চালিয়ে সত্য তুলে ধরাই সাংবাদিকদের দায়িত্ব। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক ইতিহাস বলছে, এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বারবার আক্রান্ত হয়েছেন সংবাদকর্মীরা। কখনও নির্বাচনী হিংসা, কখনও রাজনৈতিক কর্মীদের হামলা, কখনও শাসকদলের নেতাদের প্রকাশ্য কটাক্ষ, সব মিলিয়ে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন উঠেছে।
পশ্চিমবঙ্গে সাংবাদিক নিগ্রহ কোনও নতুন ঘটনা নয়, মনে পড়ছে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন এবং ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময় বহু সংবাদকর্মী হামলার শিকার হন। ভোটকেন্দ্রে খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে তাঁদের ক্যামেরা ভাঙচুর হয়েছে, মারধরের অভিযোগ উঠেছে, অনেককে কাজ বন্ধ করে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। এছাড়াও অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের উপর হামলা রোজকার ঘটনায় পরিণত হয়েছে। একাধিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন খবর করতে গিয়ে তৃণমূল নেতাদের থেকেও আক্রান্ত হতে হয়েছে সংবাদ মাধ্যমকে। কোনও ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের উপর চড়াও হয়েছে শাসক দলের উচ্চপর্যায়ের নেতারা, যেমন মহুয়া মৈত্রের মত সাংসদরা সাংবাদিকদের ২ টাকার সাংবাদিক বলে কটাক্ষ করেছেন। বহু ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের উপর চড়াও হবার ঘটনায় মামলাও হয়েছে। কিন্তু সেই মামলা রয়ে গেছে খাতায় কলমে। বড়জোর ২ একটা প্রতীকী প্রতিবাদ হয়েছে। কখনও প্রাক্তন মুখমন্ত্রী তাদের খোঁজও নেয় নি। কিন্তু সেই দৃশ্য এবার পাল্টাতে দেখল সাংবাদিক মহল।
সাম্প্রতিক সময়ে এসএফআই-ককরোচদের আন্দোলনের সময় সাংবাদিকদের উপর হামলার ঘটনায় রাজ্যের রাজনৈতিক পরিসরে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। তবে এই ঘটনার পর সরকারের প্রতিক্রিয়া অতীতের তুলনায় ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজে হাসপাতালে গিয়ে আহত সাংবাদিকদের সঙ্গে দেখা করেন, তাঁদের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন এবং স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন “সাংবাদিকরা আমাদের অ্যাসেট।” এই বার্তা নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। যেখানে সাংবাদিকদের ২ পয়সার সাংবাদিক বলে উল্লেখ করা হত প্রাক্তন শাসক দল তৃণমূলের তরফে, সেখানে বর্তমান শাসক দলের মুখ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের হাত ধরে বলেন, সাংবাদিকরা আমাদের অ্যাসেট, এই ঘটনায় মামলা রুজু করা হয় ৭টি মামলা। এই মামলাতেই ইতিমধ্যে ১৪ জন গ্রেফতার, তাদের বিরুদ্ধে গুন্ডা দমন ইন প্রয়োগ করে ব্যাবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী
সাংবাদিক আক্রান্ত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হন শুধু একজন ব্যক্তি নন; ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষের জানার অধিকারও। যে সমাজে সাংবাদিক ভয় নিয়ে মাঠে নামবেন, সেখানে স্বচ্ছতা দুর্বল হয়ে পড়বে। দুর্নীতি, অপরাধ বা প্রশাসনিক ব্যর্থতার খবর সামনে আনা কঠিন হয়ে যাবে। ফলে সংবাদমাধ্যমের নিরাপত্তা রক্ষা করা কোনও রাজনৈতিক দলের প্রতি অনুগ্রহ নয়, বরং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। বর্তমান পরিস্থিতি বোধহয় এই শর্তের সমানুপাতিক। সাংবাদিকদের একটা আক্ষেপ ছিল গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হয়েও গণতন্ত্র কখনও তাঁদের পাশে থাকে নি, সেই আক্ষেপ বোধহয় এবার ঘুচল।