পশ্চিম দুনিয়ার কাছে তিনি মৌলবাদের ভয়াল ভয়াবহ মুখ। স্বাধীনচেতা নারীর কাছে তিনি বোরখা-তন্ত্রের কুখ্যাত প্রতিনিধি। লেখকের কাছে তিনি অতর্কিত আততায়ী। এমনকি, তাঁর 'গুরু খামেইনি-র' ফতোয়ায় শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায় ভারতের প্রধানমন্ত্রীরও। এবং, নিষিদ্ধ করতে সলমন রুশদির 'স্যাটানিক ভার্সেস'!
'তিনি', আয়াতোল্লা খামেনেই। ১৯৭৯ সালে ইরানের মানুষ রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে আরও ভয়ানক যে-মৌলবাদী স্বৈরতন্ত্রের পথ প্রশস্ত করেছিল, সেই পথ দিয়েই 'আবির্ভূত' হন মোল্লাতন্ত্রের কুখ্যাত প্রতিনিধি খামেইনি। প্রথমে আয়াতোল্লা রোহল্লা খামেইনি, যাঁর ফতোয়ার সঙ্গে বাকি বিশ্বের পরিচয় ঘটে আশির দশকের শেষ দিকে। সলমন রুশদির লেখা 'স্যাটানিক ভার্সেস' নিষিদ্ধ করে তাঁর মাথার দাম ধার্য করেন এই মৌলবাদী নেতা। যাঁর ফতোয়ার কাছে নত হয়ে এ-দেশের কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী পর্যন্ত নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হন 'স্যাটানিক ভার্সেস'!
ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যমের দাবি, রোহল্লা খামেইনির শিষ্য আলি খামেইনি, মার্কিন-ইজরায়েল হানায় নিহত । আপাত দৃষ্টিতে যা একটি 'খবর' মাত্রা। এবং দূরদৃষ্টিতে যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে বাধ্য বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা।
খামেইনি ও রাজীব গান্ধী
ভারতীয় বংশোদ্ভূত লেখক সলমান রুশদি-র স্যাটানিক ভার্সেস প্রকাশিত হয় আশির দশকের শেষে। 'প্রফেট মহম্মদে'র ভাষ্যকে সেখানে 'শয়তানে ভাষ্য' হিসেবে তুলে ধরা হয়। এবং তারপরই মাঠে নামে মৌলবাদীরা। রুশদির বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগ এনে তাঁর মাথার দাম ধার্য করেন খামেইনি। অন্য দেশে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয় রুশদিকে। এমতাবস্থায়, ১৯৮৯ সালের জানুয়ারি মাসে, গ্রেট বৃটেনের ব্র্যাডফোর্ডে, মুসলিমরা রীতিমতো ধর্মীয় আচার মেনে স্যাটানিক ভার্সেসের একটি কপি পুড়িয়ে দেয়। তারপরই, ডব্লুএইচ স্মিথ ওই বইয়ের কপি সর্বসমক্ষে 'ডিসপ্লে' করা বন্ধ করে দেয়। রুশদির জন্মকর্ম যেখানে, তৎকালীন সেই বোম্বাইতে রীতিমতো দাঙ্গা বাধে এবং ১২ জন নিহত হন। তেহেরানে ব্রিটিশ দূতাবাসে যথেচ্ছ পাথর ছোড়া হয়। রুশদির মাথার দাম ধার্য করা হয় ৩ মিলিয়ন ডলার!
এ-দেশে তখন কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী। দেশের মধ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা স্পষ্ট বার্তা দেন কেন্দ্রীয় সরকারকে, রুশদির 'স্যাটানিক ভার্সেস' যেন পাঠকের হাতে-হাতে না-ঘোরে। তাই, ইতিমধ্যেই, ১৯৮৮ সালের ৫ অক্টোবর একটি শুল্ক-বিজ্ঞপ্তি জারি করে ভারতে ওই বইয়ের আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন রাজীব গান্ধী। এবং যা নিয়ে প্রবল সমালোচনার মুখেও পড়তে হয় তাঁকে। এমনকি, রুশদি নিজে রাজীব গান্ধীকে চিঠি লিখে অনুরোধ করেন, ভারতে যেন এই বইয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। এমতাবস্থায়, কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকার দাবি করে, স্যাটানিক ভার্সেস-এর আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে মাত্র, বইটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়নি। যদিও, এই সরকারি ভাষ্য, আদতে কথার মারপ্যাঁচ ছাড়া আর কিছুই নয় বলে মনে করে শিল্পী-সাহিত্যিক মহল।
এরপর কেটে যায় ৩৬ বছর। ২০২৪ সালের শেষের দিকে, অনেক আইন-আদালতের পর এ-দেশের বুকস্টোরে রুশদির স্যাটানিক ভার্সেস ফিরে আসে। যদিও,গুরু-শিষ্য খামেইনির বিষাক্ত মৌলবাদ তখনও চলমান। ২০২২ সালে, নিউ ইয়র্কে এক সাহিত্য সম্মেলনে এক আততায়ীর হাতে ছুরিকাহত হন রুশদি। প্রাণে বেঁচে গেলেও তাঁর একটি চোখ পুরোপুরি দৃষ্টিশক্তি হারায় (এর কয়েকবছর পর প্রকাশিত হয় রুশদির 'নাইফ')।
বোরখা-তন্ত্র
এখানেই শেষ নয়। একদা ইরানে যখন রাজতন্ত্র চালু ছিল, তখন মহিলারা অনেক স্বাধীনভাবে রাস্তাঘাটে বেরোতে পারতো, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারতো, চাকরি-বাকরিও করতে পারতো। কিন্তু, রাজতন্ত্র উচ্ছেদের পর এবং ১৯৮৯ সালে ইরান পুরোপুরি খামেইনির নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার পর, সেখানে বোরখা না-পরলে রীতিমতো চাবকানো হতো মহিলাদের। মহিলাদের জেলে পুরে দেওয়া থেকে শুরু করে মৃত্যুদণ্ড, কোনওটাই বাদ ছিল না সেখানে। অবশেষে, অতি সম্প্রতি যখন ইরানে গণ বিদ্রোহ শুরু হয়, তখন তা নৃশংসভাবে দমন করে মোল্লাতন্ত্রের সরকার। বেসরকারি হিসেব মতো, ৫ হাজার যুবক-যুবতীর মৃত্যু হয় এবং আরও হাজার-হাজার জেলবন্দি হন।
অবশেষে নিঃশব্দ খামেইনি। এবং, সেই সঙ্গে নিঃশব্দ আসল 'শয়তানের ভাষ্য'।