এবার আর 'খোলা চিঠি' নয়। 'জনসংযোগে'র মোড়কে একেবারে খোলাখুলি নির্বাচনী ময়দানে নেমে পড়লেন নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগে সাড়ে তিনবছর জেল খেটে আসা রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়। বেহালা যাওয়ার পথে সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তরে জানালেন, "একটাই বার্তা, আমি তোমাদেরই লোক। অসীম স্নেহে, ভালোবাসায়, আশীর্বাদে পরপর পাঁচবার বিধানসভায় আমাকে জয়ী করেছেন সেখানকার মানুষজন। আমি প্রথম থেকেই বলে আসছি যে, শারীরিকভাবে অন্তত গাড়়িতে ওঠার শক্তি যতক্ষণ থাকবে, আমি বেহালাতেই যাবো"।
কারারুদ্ধ পার্থর জামিনে কারামুক্তির পর গত বছরের নভেম্বরে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছিল, ছাব্বিশে কি বেহালা পশ্চিম থেকে পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে প্রার্থী করবে তৃণমূল?
পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ মনে করেছিলেন, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তার অন্যতম কারণ, শোভন চট্টোপাধ্যায়ের ঘরওয়াপসি। প্রেম-পরকীয়া যা-ই করুন-না কেন শোভন, দুর্নীতির দায়ে সাড়ে তিনবছর জেল খাটতে হয়নি তাঁকে। এমতাবস্থায়, বেহালার কোনও বিধানসভা কেন্দ্র থেকে তাঁর প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল। এদিকে, দল ছেড়ে বিজেপিতে যাওয়ার সুযোগে, একুশের বিধানসভায় তাঁর স্ত্রী রত্না চট্টোপাধ্যায় বেহালা পূর্ব থেকে তৃণমূলের টিকিটে দাঁড়িয়ে জয়ী নির্বাচিত হন। এমতাবস্থায়, শোভন-বৈশাখি-রত্না-র ত্রিকোণ সম্পর্ক ও আদালতে চুলোচুলি চলতেই থাকে। এবং, কোনও পক্ষই আদালতে বিশেষ সুবিধা করতে পারে না। অগত্যা, রত্নার থেকে ডিভোর্স না-পেয়ে বৈশাখির সঙ্গে লিভ টুগেদার দীর্ঘায়িত করে শোভন।
পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, 'দিদি'র প্রিয় 'কানন' ঘরে ফিরে এলেও বেহালা পূর্ব থেকে তাঁকে প্রার্থী করা কার্যত অসম্ভব। কারণ, তাহলে রত্নাকে বেহালা পূর্ব থেকে অন্যত্র সরাতে হয়। এবং 'পথের কাঁটা' মনে করে রত্নাকে উপড়ে ফেললে তাঁর প্রভাবশালী বাবা ও মহেশতলার তৃণমূল নেতা দুলাস দাস তা মোটেও ভালো ভাবে নেবেন না। শুধু তা-ই নয়। রত্নাও বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে পারিবারিক কেচ্ছার কথা আরও বেশি করে সামনে তুলে ধরে শোভন তথা তৃণমূলকে বিড়ম্বনায় ফেলতে পারেন। ছাব্বিশের হাইভোল্টেজ ভোটের আগে আদৌ সেই ঝুঁকি নিতে চাইবেন না মমতা ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
এমতাবস্থায়, শোভনের পুনর্বাসন হতে পারে বেহালা পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্রে। প্রসঙ্গত, তৃণমূলে ঘরওয়াপসির পর শোভনের ছবি দেওয়া ফ্লেক্স রাস্তায় উঁকিঝুকি দিয়েছিল সেখানে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে মমতা-অভিষেকের কাছে পার্থর চেয়ে অন্তত দু-চারগোলে এগিয়ে রয়েছেন শোভন। এবং তা-ই যদি হয়, তাহলে পার্থ বেহালা পশ্চিমে টিকিট পাবেন না। বেহালা পূর্ব ইতিমধ্যেই রত্নার দখলে। যেহেতু 'বেহালা দক্ষিণ' বলে কিছু নেই, তাই 'বেহালার উত্তর' খুঁজতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়।
'আমি তোমাদেরই লোক'
বামজমানায় বিরোধী নেত্রী হিসেবে যখন তাঁর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে, তখন থেকেই রবীন্দ্রনাথের সেই অমোঘ উচ্চারণকে সঙ্গী করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, 'মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক'। বাংলায় পালাবদলের পর যখন তিনি মুখ্যমন্ত্রী হন, তখনও তাঁর ছবির সঙ্গে থাকে রবি ঠাকুরের কবিতার এই লাইন, 'আমি তোমাদেরই লোক'।
এই পরিস্থিতিতে, পার্থ চট্টোপাধ্যায় বেহালা পশ্চিমে গিয়ে বলছেন, 'মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক'। এখন প্রশ্ন একটাই, নিজের বিধানসভা থেকে ফের প্রার্থী হতে চেয়ে পার্থ চট্টোপাধ্যায় ঠিক কার দ্বারস্থ হচ্ছেন, রবীন্দ্রনাথের না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের?