অসীম সেন: ভোট বাজারে এরা কেউ কেউ এককথায় ঘাসফুলের অচল পয়সা ছিল, আবার কেউ কেউ শুধুমাত্র ভোট সমীকরণে টিকিট পেয়েছেন। মোটের ওপর গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে জেরবার, অবহেলিত, অপমানিত। কিন্তু এদের জন্যই আজকে তবুও তৃণমূল...
অসীম সেন: ভোট বাজারে এরা কেউ কেউ এককথায় ঘাসফুলের অচল পয়সা ছিল, আবার কেউ কেউ শুধুমাত্র ভোট সমীকরণে টিকিট পেয়েছেন। মোটের ওপর গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে জেরবার, অবহেলিত, অপমানিত। কিন্তু এদের জন্যই আজকে তবুও তৃণমূল রাজ্যের আঙ্গিকে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখতে পেরেছে। যে সব প্রদীপের আলোয় ঘাসফুল এতদিন আলোকিত হত, তাদের সকলের তেল যে শুকিয়ে গিয়েছে বোঝা যায়নি ফল প্রকাশের আগ পর্যন্ত। চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, অরূপ বিশ্বাস, শশী পাঁজা, উদয়ন গুহ, সুজিত বসু, ব্রাত্য বসু। বঙ্গরাজনীতির মেসি, রোনাল্ডো, নেইমাররা সকলে গড়াগড়ি খেল। আর একটা নাম না করলেই নয়। স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে গিয়ে পায়ে প্লাস্টার করেও জনসমর্থন টানতে পারেননি নিজের দিকে। শুভেন্দু অধিকারীর কাছে গো হারা হেরেছিলেন। লোর্ডশেডিং তত্ত্ব দিয়েছিলেন, কিন্তু ধোপে টেকেনি। কোনওভাবে সাপ্লি দিয়ে নিজের মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ার সামলিয়েছিলেন। এবার সে সুযোগও রইল না। নিজের কেন্দ্র ভবানীপুরে হার! শুভেন্দু এবার দুঃস্বপ্নে আসবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ার তো হারালেনই, বিরোধী নেতা হিসেবেও স্বীকৃতি পাবেন না।
এ আবহে আরএকটা বিষয় আলোচনায় তুলে ধরা যাক, যাক তৃণমূলের জয়ী প্রার্থীদের মধ্যে বড় অংশ মুসলিম। যাদের ভোট রাজনীতিতে তুরুপের টেক্কা হিসেবে ব্যবহার করে এসেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্তত এমনটাই মনে করেন মুসলিমদের একটি বড় অংশ এবং অবশ্যই বিরোধী শিবির। এরা যদি কোনওভাবে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তাহলে বিধানসভায় তৃণমূলের বাতি দেবার কেউ থাকবেন কিনা সন্দেহ রইল। এবার আলোচনা করা যাক সেই সব নাম নিয়ে, যারা তৃণমূলের ভরা যৌবনে রীতিমত ব্রাত্য ছিলেন। ২০২৬ সালে উত্তর বঙ্গে অনেক কষ্টে ঘাসফুলের ভোট নজরে এসেছে। সেখানে কোচবিহারের সিতাই আসনটি ধরে রাখতে পেরেছে তৃণমূল। এই আসন থেকে জয়ী হয়েছেন সঙ্গীতা রায়। যদিও মনোনয়নে জাল শংসাপত্র দাখিল করার অভিযোগ উঠেছিল তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থীর বিরুদ্ধে। ২০২৪ এর উপনির্বাচনে যেখানে তিনি ১ লক্ষ ৩০ হাজার ভোটে জিতেছিলেন, সেখানে ২০২৬ এর জয়ের ব্যবধান এসে দাঁড়ায় মাত্র ২৭০০ ভোটে। তবুও উত্তরবঙ্গে দুর্মুল্য একটি সিট সঙ্গীতা রায় তৃণমূলকে উপহার দিয়েছেন। ২০১৬ সালে ইসলামপুরে হাত চিহ্নে জিতেছিলেন কানাইয়ালাল আগরওয়াল। এরপরে কানাইয়ালাল তৃণমূলে যোগ দিলেও ২০২১ সালে সিঁকে ছেড়েনি। আব্দুল করিম চৌধুরীতেই ভরসা রেখেছিল ঘাসফুল।
গোষ্ঠীদ্বন্দে জেরবার হয়ে গিয়েছিল উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুর। ২০২৬ সালে উপায় না দেখে টিকিট দেওয়া হয় কানাইয়ালালকে। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বিধানসভায় জিতলেন কানাইয়ালাল। মালদার হরিশচন্দ্রপুরে টিকিট না পেয়ে প্রকাশ্যে ফোঁস করেছিলেন মন্ত্রী তাজমুল। হরিশচন্দ্রপুরে এবার ঘাসফুলের টিকিট পেয়েছেন ২০২১ সালে বিজেপির টিকিটে লড়া মতিউর রহমান। ভোটের দিন কংগ্রেসের হয়ে ভোট করানোর অভিযোগ ও উঠেছিল তাজমুলের বিরুদ্ধে। এই কেন্দ্রে তৃণমূলকে জিতিয়েছে দলবদলু মতিউর। গতবার বিধানসভা ভোটে চোপড়ায় ঘাসফুলের আস্থা না পেয়ে রুকবানুর রহমানের বিরুদ্ধে নির্দল প্রার্থী হয়েছিলেন জেবের শেখ। তিনিই ২০২৬ এ তৃণমূল প্রার্থী। এবং ঘাসফুলকে জিতিয়েছেন ৩০ হাজার ভোটে। রেশন দুর্নীতি মামলায় ভুরি ভুরি অভিযোগ ছিল তৃণমূল নেতা আনিসুর রহমান বিদেশের বিরুদ্ধে। তবে ভোট বৈতরণী পেরোতে তাকেই ২০২৬ সালে প্রার্থী হিসেবে বেছে নেয় ঘাসফুল। একই দুর্নীতিতে অভিযুক্ত জ্যোতিপ্রিয় মল্লিককে মানুষ প্রত্যাখ্যান করলেও। জিতে গেলেন আনিসুর রহমান বিদেশ। বিজেপি ঘনিষ্ঠতার অভিযোগে প্রকাশ্যে মিনাখাঁর উষারানি মণ্ডলকে ভর্ৎর্সনা করেছিলেন ঘাসফুল সুপ্রিমো। তবুও ২০২৬ সালে সেই উষারানির ওপরেই আস্থা রেখেছিলেন মমতা। ভাগ্যিস রেখেছিলেন। মিনাখাঁয় তৃণমূলকে জয় এনে দিয়েছেন উষারানি। মোটের ওপর এই নামগুলির কেউই তৃণমূলের অটোমেটিক চয়েস ছিল না। এরকম নাম আরও রয়েছে। যদি এরা না থাকতেন তাহলে তৃণমূলের বিধায়কের সংখ্যা পঞ্চাশের তলায় নেমে যেত বলে মনে করছেন রাজনৈতিক মহল।
rnrn