অসীম সেনঃ লাল ল্যান্ডফোনটা আর ব্যবহার হয় না এখন। ফোনের একপাশে শেখ হাসিনা অপর প্রান্তে খালেদা জিয়া। রাজনীতির আঙিনা ছাপিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঢুকে পড়েছিল ব্যক্তি জীবনেও। রাজনীতির কারবালায় অনেক কিছু...
অসীম সেনঃ লাল ল্যান্ডফোনটা আর ব্যবহার হয় না এখন। ফোনের একপাশে শেখ হাসিনা অপর প্রান্তে খালেদা জিয়া। রাজনীতির আঙিনা ছাপিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঢুকে পড়েছিল ব্যক্তি জীবনেও। রাজনীতির কারবালায় অনেক কিছু হারিয়েছেন জিয়া। ১৯৭১ এর পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছিল দুই পরিবারকে কেন্দ্র করে। চলতি বছরের জুলাই বিপ্লবের লড়াই দীর্ঘদিনের পর দেশে পা রাখার অনুমতি দেয় খালেদা জিয়াকে। দিনের বেলায় রোদ চশমা। রাতের বেলায় মোটা ফ্রেমের চশমা। সম্ভ্রান্ত পরিবারের মহিলা, মাথায় ঘোমটা ছিল বরাবর। আজ গোটা পৃথিবী তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। শোক জানিয়েছেন শত্রু অথবা মিত্র শেখ হাসিনা। লাল টেলিফোনের রিসিভার ধরার দুপাশেই আর কেউ উপস্থিত নেই এই মুহূর্তে। জন্মসূত্রে খালেদা কিন্তু জলপাই গুড়ির মেয়ে। ছোট বেলায় নাম ছিল খালেদা খনম পুতুল। পুতুলের বিয়ে হল জিয়াউর রহমানের সঙ্গে। জিয়ায়ুর তখন পাক সেনার ক্যাপটেন। স্বামীর পদবী ধারণ করে নুতুন নাম হল খালেদা জিয়া। এরপর নানা টানাপোড়েনের সাক্ষী রইল বাংলাদেশ। ত্রিশ লক্ষ মানুষের লাস দিয়ে তৈরি হল নতুন দেশের ভিত । ১৯৭৭ সালে দেশের প্রেসিডেন্ট হন স্বামী। পরের বছর তৈরি হয় বিএনপি। এই প্রথম পর্দা সরিয়ে পুতুল, মানুষের সামনে আসেন। ১৯৮১ সালে জিয়াউর খুন হলে সক্রিয় রাজনীতিতে দেখা যায় খালেদা জিয়াকে। ১৯৮৩ সালে বিএনপির সভাপতি হন।

স্বামীকে কেড়েছে রাজনীতি। নিজের ছেলেকেও হারিয়েছেন অসময়ে। এরশাদের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে শুরু করে শেখ হাসিনা। বারবার মূল্য চোকাতে হয়েছে। ও দেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী। মোট তিন দফা সরকার গড়েছিলেন। প্রথম দফায় শিক্ষাখাতে আগের তুলনায় ৬০ শতাংশ বেশি বাজেট বরাদ্দ করেছিলেন। ২০১৮ সালে দু’টি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় দুর্নীতির অভিযোগে ১৭ বছরের কারাদণ্ড হয় তাঁর। তথ্য বলছে, খালেদার জমানায় ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বে দুর্নীতির সূচকে এক নম্বরে ছিল বাংলাদেশ। সমর্থন পেয়েছেন, বিরোধিতা সহ্য করেছেন। ভারত বিদ্বেষী বলেই পরিচিত ছিলেন খালেদা জিয়া। তার কথায় অধীনতা মূলক বিদেশনীতি তিনি চান না ভারতের সঙ্গে। ২০১২ সালে শেষবার ভারতে এসেছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন বিরোধী নেত্রী খালেদা। সেদিনও সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যার কথা জানিয়েছিলেন বিজেপি নেত্রী সুষমা স্বরাজকে। উঠেছিল তিস্তার জলবণ্টন প্রসঙ্গ। মূলত ২০০৬ সাল থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধীরে ধীরে অপ্রাসঙ্গিক হতে থাকেন জিয়া।

এর প্রধান কারণ অবশ্য শারীরিক অবস্থার অবনতি। শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। কী সেই শর্ত? রাজনৈতিক কার্যকলাপে যুক্ত হতে পারবেন না তিনি। বিতর্ক সব সময় তার সঙ্গের সঙ্গী। ২০০৪ সালে হাসিনাকে হত্যার জন্য গ্রেনেড হামলার প্রধান অভিযুক্ত ছিলেন খালেদা পুত্র তারেক। বাংলাদেশ নামক চুম্বকের দুটি বিপরীত মেরু ছিলেন হাসিনা ও খালেদা। অসৌজন্য ছিল তাদের রাজনীতির মূল। খালেদার ছোট ছেলের অকালপ্রয়ানে হাসিনাকে নিজের বাড়িতে ঢুকতে দেননি। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে পাক সেনার বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন জিয়াউর। বর্তমানে শেখ হাসিনার দেশত্যাগে ধরে নেওয়া গিয়েছিল ফের মুল কক্ষে ফিরবে বিএনপি। কিন্তু খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে মুখ হারালো বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্টি। এবার দলকে ভবিষ্যতের দিশা দেখাবেন খালেদা পুত্র। খালেদার মৃত্যুতে শোকের আবহ বাংলাদেশে। শোক দেখিয়েছেন হাসিনাও। কিন্তু রাজনীতির সমীকরণ বলছে এবার হয়তো ফের অক্সিজেন পাবে আওয়ামী লিগ। কারণ শান্তিতে থাকতে চাওয়া বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এখনও জামায়েতী ইসলামের হাত ধরে কট্টর পন্থী হতে চাইছে না। চাইছে না শরিয়তি আইন।
