তিলোত্তমা কলকাতা, জোব চার্নকের কলকাতা। ভারতের মেগাসিটি গুলির অন্যতম। ভারতের সেফেস্ট সিটি। এই কলকাতা জেলাতেও বেজে গেছে বিধানসভার বাজনা। বিধানসভা নির্বাচন মানেই জেলা কলকাতা খবরের শিরোনামে। এবারের নির্বাচনের কলকাতায় পাল্লা ভারি কার তা নিয়ে জল্পনাও তুঙ্গে। কলকাতায় পাল্লাভারি যার রাজ্যেও তারই ডঙ্কা বাজবে। এমনটাই ধরে নেওয়া হয়। আমরা আলোচনা করব কিন্তু সব থেকে আগে জেনে নেব জেলার সীমানা
জেলার সীমানা
পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা। বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, রাজনীতি, সবকিছুর প্রাণ। কলকাতা আয়তনের দিকথেকে পশ্চিমবঙ্গের সবথেকে ছোট জেলা। এখানে কোনও গ্রামীণ এলাকা নেই। তবে বৃহত্তর কলকাতার মধ্যে পার্শ্ববর্তী বেশ কয়েকটি জেলার অংশ রয়েছে। কলকাতার উত্তরে রয়েছে উত্তর ২৪ পরগণা জেলা। দক্ষিণে দক্ষিণ পরগণা জেলা। পূর্বে উত্তর এবং দক্ষিণ ২৪ পরগণা উভয় জেলার অংশ। এবং পশ্চিমে হাওড়ার থেকে আলাদা করেছে হুগলি নদী। কলকাতা জেলায় মোট ১১ টি বিধানসভা কেন্দ্র রয়েছে এই কেন্দ্রগুলি মূলত কলকাতা উত্তর এবং কলকাতা দক্ষিণ লোকসভার অন্তর্গত। বিধানসভা গুলি হল, চৌরঙ্গি, এন্টালি, বেলেঘাটা, জোরাসাঁকে, শ্যামপুকুর, মানিকতলা, কাশীপুর বেলগাছিয়া, বালিগঞ্জ, কলকাতা বন্দর, রাসবিহারী এবং ভবানীপুর।
ভোট ইতিহাস, ভোট ফল
এগারটি বিধানসভা এবং দুটি লোকসভা। শেষ দুটি লোকসভা এবং বিধানসভা নির্বাচন বিশ্লেষণ করলে আগামী বিধানসভা নির্বাচনের একটি আঁচ পাওয়া সম্ভব। চলুন দেখে নেওয়া যাক জেলা কলকাতার মানুষের ভরসা কোন দিকে?
চৌরঙ্গি
২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনে চৌরঙ্গি কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়। হারিয়েছিলেন কংগ্রেসের হাইভোল্টেজ নেতা সোমেন মিত্রকে। ২০২১ সালেও এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে ইতিমধ্যে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে ভারতীয় জনতা পার্টি।
এন্টালি
এন্টালি কেন্দ্র থেকে ২০১৬ ও ২০২১ সালে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের স্বর্ণকমল সাহা। তবে ২০১৬ সালে এই কেন্দ্রে দ্বিতীয় স্থানে সিপিএম থাকলেও ২০২১ সালে এই কেন্দ্রে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে ভারতীয় জনতা পার্টি
বেলেঘাটা
বেলেঘাটা কেন্দ্রে ২০১৬ এবং ২০২১ সালে জয় পান তৃণমূলের হেভিওয়েট নেতা পরেশ পাল
জোড়াসাঁকো
এই কেন্দ্র থেকে ২০১৬ সালে জয় পান তৃণমূল কংগ্রেসের স্মিতা বক্সি। ২০২১ সালে এই কেন্দ্র থেকে জয় পেয়েছিলেন তৃণমূলের বিবেক গুপ্ত।
শ্যামপুকুর
শ্যামপুকুর কেন্দ্র থেকে ২০১৬ ও ২০২১ সালে জয় পেয়েছিলেন তৃণমূলের ডা. শশী পাঁজা।
মানিকতলা
২০১৬ সালে মানিকতলা কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সাধন পান্ডে। ২০২১ সালেও সাধন পাণ্ডেকেই এই কেন্দ্র থেকে বেছে নিয়েছিলেন মানুষ।
কাশীপুর-বেলগাছিয়া
কাশীপুর-বেলগাছিয়া কেন্দ্র থেকে ২০১৬ সালে জয় পেয়েছিলেন তৃণমূলের মালা সাহা। এবং ২০২১ সালে এই কেন্দ্র থেকে জয় পেয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের অতীন ঘোষ
বালিগঞ্জ
২০১৬ ও ২০২১ সালে বালিগঞ্জ কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সুব্রত মুখোপাধ্যায়। ২০২১ সালে সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যু হলে ২০২২ সালে এই কেন্দ্রে উপনির্বাচন হয়। জয় হন তৃণমূল কংগ্রেসের বাবুল সুপ্রিয়।
কলকাতা বন্দর
২০১৬ এবং ২০২১ সালে কলকাতা বন্দর কেন্দ্র থেকে জেতেন তৃণমূল কংগ্রেসের ফিরহাদ হাকিম
রাসবিহারী
২০১৬ সালে রাসবিহারী কেন্দ্র থেকে জয়ী হন তৃণমূল কংগ্রেসের শোভনদেব চট্টোপাধ্য়ায়। ২০২১ সালে এই কেন্দ্র থেকে জেতেন তৃণমূলের দেবাশিষ কুমার
ভবানীপুর
২০১৬ সালে ভবানীপুর কেন্দ্র থেকে জেতেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০২১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন্দীগ্রাম থেকে দাঁড়ালে ভবানীপুর কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের পতাকায় জেতেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর কাজে পরাজিত হলে। ভবানীপুরের বিধায়ক পদ থেকে পদত্যাগ করেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। এই কেন্দ্রের ফের উপনির্বাচন হয়। জয়ী হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অপরদিকে কাজল সিনহার মৃত্যুর ফলে খড়দায় উপনির্বাচন হয়। সেখান থেকে জয়ী হন তৃণমূলের শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। এবং মন্ত্রিসভায় স্থান পান।
লোকসভার হিসেব
২০১৬ এবং ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনে কলকাতা জেলায় একশয় একশ পেয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। তবে ২০১৬ সালের তুলনায় ২০২১ সালে ভোট শতাংশের হিসেবে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি। এবার আসা যাক লোকসভার ফলে ২০১৯ ও ২০২৪ এর লোকসভা নির্বাচনে কলকাতা উত্তর লোকসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হন তৃণমূল কংগ্রেসের সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতা দক্ষিণ লোকসভা কেন্দ্র থেকে এই দুই লোকসভা নির্বাচনে জয়ী হন তৃণমূলের মালা রায়। তাহলে এককথায় বলাই যায় কলকাতায় ঘাসফুলের শক্তি প্রশ্নাতীত বেশি। তবে ২০২৬ এর নির্বাচনে কী ফল হতে চলেছে? বিভিন্ন মত পোষন করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
এবারের ভোট ইস্যু
শহর কলকাতার ওপর নির্ভর করে নির্বাচন হয় গোটা বঙ্গে। ২০২৬ এ কোন কোন ইস্যুর ওপর নির্ভর করে ভোট হবে?
এবারের বিধানসভা নির্বাচনে কলকাতার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু প্রাধান্য পাচ্ছে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সবথেকে আলোচিত বিষয় হল স্পেশাল অনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর। এসআইআর এর সুনামি যে কলকাতাতে উঠবে তা তো স্বাভাবিক। তৃণমূলের অভিযোগ নির্বাচন কমিশন বিজেপির সঙ্গে যোগসাজস করে প্রকৃত ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ দিচ্ছে। প্রতিবাদে ধর্মতলায় অবস্থান বিক্ষোভও করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। অন্যদিকে বিরোধী শিবির অনুপ্রবেশ ইস্যু নিয়ে সরব হয়েছে। বিরোধী দলগুলো বিশেষ করে বিজেপি এবং বামফ্রন্ট সরকারি নিয়োগ দুর্নীতি এবং রেশন দুর্নীতির মতো বিষয়গুলোকে কলকাতার ভোটারদের কাছে অন্যতম বড় ইস্যু হিসেবে তুলে ধরছে। শহরের ঘনবসতি এবং সরু রাস্তার ফলে ট্রাফিক জ্যাম মাথা ব্যথার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত নগরায়ণের ফলে শহরের জলাভূমি ভরাট হয়ে যাচ্ছে। শতাব্দীর পুরনো ড্রেনেজ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা শহরের বর্তমান চাহিদার সাথে তাল মেলাতে পারছে না। যার ফলে বর্ষায় শহরের অধিকাংশ অঞ্চল জলের তলায় চলে যায়।
একইসঙ্গে মেট্রো রেলের সম্প্রসারণের কাজ দীর্ঘায়িত হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটছে। তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের কাছে কর্মসংস্থান এবং পরিকাঠামো উন্নয়ন একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কলকাতার এবং আশেপাশের ২৮টি আসনের মধ্যে অন্তত ২২টিতে জয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন। বোঝাই যাচ্ছে বিরোধীদের পাখির চোখ কলকাতা।
তিলোত্তমার ভোট উৎসবে নজর থাকবে সকলের। ঘাসফুল নিজেদের শক্তি ধরে রাখতে তৎপর থাকবে। বিরোধীরা চাইবে তিলোত্তমায় নিজেদের অধিকার দখল করতে। কী হতে চলেছে নির্বাচনে, তা অবশ্য সময় বলবে।