অসীম সেনঃ দড়িটা কয়েকবার কেঁপে থেমে গিয়েছিল। উপস্থিত জনগন একজন হিন্দুর ফাঁসি নিজের চোখে দেখার পাপ মোচনের জন্য কোন গঙ্গার ঘাটে স্নান করবে তা নিয়ে আলোচনায় মগ্ন। তখন হেস্টিংস সাহেবের ঠোঁটের কোণায় একটা বা...
অসীম সেনঃ দড়িটা কয়েকবার কেঁপে থেমে গিয়েছিল। উপস্থিত জনগন একজন হিন্দুর ফাঁসি নিজের চোখে দেখার পাপ মোচনের জন্য কোন গঙ্গার ঘাটে স্নান করবে তা নিয়ে আলোচনায় মগ্ন। তখন হেস্টিংস সাহেবের ঠোঁটের কোণায় একটা বাঁকা হাসি কি কেউ লক্ষ্য করেছিল? খিদিরপুরের কাছে কুলিবাজার অঞ্চল আজ পরিচিত হেস্টিংস নামে। ১৯৭৫ সালে সে জায়গা ছিল পাণ্ডব বর্জিত। ৫ অগস্ট সেই শুনশান রাস্তায় ভীড় চোখে পড়ার মত। বিচারের মুখোশে একটা চক্রান্তের নাটক অভিনীত হল হাজার দর্শকের সামনে।কলিকাতা সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ফাঁসি। বিচারপতি এলিজা ইম্পে সেদিন বন্ধুত্বের দাম মিটিয়েছিলেন কড়ায় গণ্ডায়। ওয়ারেন হেস্টিংসের প্রতিশোধের আগুন বোধহয় শান্ত হয়েছিল।

ঘটনার সূত্রপাত আরও অনেক দিন আগে।গোটা ঘটনা বুঝতে মহারাজা নন্দকুমারের প্রথম জীবনের কথা আলোচনা প্রয়োজন। নন্দকুমারের বাবা পদ্মনাভ রায় ছিলেন মুর্শিদকুলি খাঁ র প্রধান আমিন। পরে বিভিন্ন শাসক বদলে আলীবর্দি খা মুর্শিদাবাদের মসনদে বসেন। তখন পদ্মনাভ রায়ের সুপারিশে নন্দকুমার মিরজাফরের অধীনে রাজস্ব বিভাগে দেওয়ান পদে নিযুক্ত করেন। এর কিছুদিনের মধ্যে সিংহাশনে বসেন সিরাজউদ্দোলা। সিরাজ কিন্তু আলীবর্দি খাঁ এর যোগ্য উত্তরসূরী ছিলেন না কোনওদিনই। সীমাহীন অনাচার, ভোগ, লালসা, বদমেজাজ সকল কিছুর জন্যই তিনি ধীরে ধীরে তাঁর রাজসভার প্রায় সকলের কাছে বিরোধিতার পাত্র হয়ে ওঠেন। ইতিমধ্যে রবার্ট ক্লাইভ ষড়যন্ত্রের জাল বিছোলে মীরজাফরকে সামনে রেখে অনেকেই সেই ষড়যন্ত্রে সামিল হলেন। ক্লাইভের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন রাজা নন্দকুমার।

অবশ্য তখনও তিনি রাজা উপাধি পাননি। পলাশীর যুদ্ধে নবাবের পতন হয়। এরপর নন্দকুমারের প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়তে থাকে। গহনার ব্যবসার সঙ্গেও তিনি যুক্ত হন। মহারাজা উপাধি পান মুঘল সম্রাটের কাছ থেকে। এ সময় নন্দলাল আর্থিক তছরূপের অভিযোগ আনেন ওয়ারেন হেস্টিংসের বিরুদ্ধে। অপমানিত হেস্টিংস পাল্টা আর্থিক অসঙ্গতির অভিযোগ আনেন। এরপর শুরু হয় ব্রিটিশ শঠতা। পলাশির যুদ্ধে সিরাজের বিরোধিতা ছিল দেশীয় রাজনৈতিক কৌশল। মিরজাফর সহ প্রায় সকলেই পরবর্তীকালে ব্রিটিশ দের সমস্যায় ফেলে মুর্শিদাবাদের সিংহাশনে বিকল্প দেশীয় রাজের পরিকল্পনা ঠিক করে রেখেছিল। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে এদের প্রত্যেককেই ব্রিটিশ শক্তি চরম পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছিল। নন্দকুমারের মামলাটি ছিল সামান্য আর্থিক জালিয়াতির। এই সামান্য অভিযোগে কাউকে ফাাঁসি দেওয়ার কথা ভাবাও যেত না। আসলে নন্দকুমারকে যেনতেন প্রকারেণ রাস্তা থেকে সরিয়ে দেবার উদ্যোগ ছিল হেস্টিংসের। অতীতের অপমান তো ছিলই, তার উপর নন্দকুমার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নানাভাবে দেশীয় রাজশক্তিকে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন। ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানি আভাষ পেয়েছিল, কিন্তু নন্দকুমারকে বাগে আনতে পারেনি কিছুতেই। তখনই এলো সুযোগ। হেস্টিংসের পরামর্শে নন্দকুমারের বিরুদ্ধে আর্থিক জালয়াতির অভিযোগ আনেন তারই ব্যবসায়ী অংশিদারের ছেলে গঙ্গাবিষ্ণু। ততদিনে কলকাতায় সুপ্রিম কোর্ট স্থাপিত হয়ে গিয়েছে। বিচারপতি এলিজা ইম্পে ছিলেন হেস্টিংসের বাল্যবন্ধু।

১৯৭৫ সালের ৫ অগাস্ট নন্দদুলালকে ফাঁসির শাস্তি দেওয়া হয়। এরপরেও এই মামলা গড়িয়েছিল ব্রিটিশ পার্লামেন্টে। কারণ নন্দকুমার যে মামলায় শাস্তি পেয়েছিলেন সে মামলা শুরু হয়েছিল কলকাতা সুপ্রিমকোর্ট প্রতিষ্ঠার আগে। সুতরাং এই মামলা কলকাতা সুপ্রিমকোর্টের এক্তিয়ারভুক্ত নয়। দ্বিতীয়ত এই ধরণের মামলায় ভারতীয় আইন অনুসারে ফাঁসির শাস্তি দেওয়া যেতে পারে না। কিন্তু ততদিনে ফাঁসির দড়ি গলায় পড়ে নিয়েছেন নন্দকুমার। নন্দকুমারের বাংলার ইতিহাসে পরিচিত একজন বিশ্বাসঘাতক। তাই তাঁর ফাঁসিকে অনেকেই ঈশ্বরের মার হিসেবে ধরে নিয়েছেন। কিন্তু ব্রিটিশ ষড়যন্ত্রের বিষয়টা একবারের জন্য হলেও মাথায় আনতে হবে।