Updated on : 27 April 2026 | 01:22:13 pm
Updated on : 27 April 2026 | 01:22:13 pm
অত্যন্ত জনবহুল ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেলা উত্তর ২৪ পরগনা। উত্তর ২৪ পরগনা জেলা বেশিরভাগ সময়েই সংবাদের শিরোনামে। বিধানসভা নির্বাচন এই জেলায় সবসময় বাড়তি গুরুত্ব পায়। হাজার সমীকরণ। এই জেলার ভোট মানে উঠে আসে অনুপ্রবেশের অভিযোগ। আসে পিঠে তত্ত্ব। উত্তর ২৪ পরগনার নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করব। তবে তার আগে দেখে নেব জেলার সীমানা
জেলার সীমানা
কলকাতার গা ঘেঁষা এই জেলায় রয়েছে শিল্প নগর ব্যারাকপুর, আইটি সেক্টর বিধাননগর, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র বনগাঁ-পেট্রাপোল সীমান্ত। এই জেলায় রয়েছে দক্ষিণেশ্বর ও আদ্যাপীঠের মত ঐতিহাসিক স্থান। রয়েছে ইছামতী, জেলার উত্তরে নদিয়া জেলা। দক্ষিণে দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও কলকাতা। পূর্বে বাংলাদেশের খুলনা ও যশোর। এই জেলাটি বাংলাদেশের সঙ্গে প্রায় ২৩০ কিলোমিটার সীমানা ভাগ করে। এবং পশ্চিমে রয়েছে কলকাতা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা। উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় ৩৩ টি বিধানসভা ক্ষেত্র রয়েছে।
ভোট ইতিহাস, ফোট ফল
বড় জেলা উত্তর ২৪ পরগনা। জেলায় হাজার রাজনৈতিক সমীকরণ, রয়েছে অনুপ্রবেশ, রয়েছে সীমান্তে চোরাচালান, রয়েছে বারুদের স্তুপ, রয়েছে পিঠে তৈরির কারখানা। আজকের বাংলা তুমি কার এ চলুন দেখে নেওয়া যাক উত্তর ২৪ পরগনার হ্যাপেনিং কয়েকটি বিধানসভা ক্ষেত্র নিয়ে।
বারাসত
২০১৬ এবং ২০২১ সালে বারাসত বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূলের চিরঞ্জীত চক্রবর্তী।
ব্যারাকপুর
ব্যারাকপুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ২০১৬ সালে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের শিলভদ্র দত্ত। ২০২১ সালে এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হন তৃণমূলের রাজু চক্রবর্তী
ভাটপাড়া
২০১৬ সালে ভাটপাড়া কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূলের বাহুবলী নেতা অর্জুন সিং। ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনের আগে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন। এবং লোকসভায় বিজেপি প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন। ২০২১ সালে তিনি বিজেপি থেকে টিকিট পাননি। এই আসনটি জিতেছিলেন বিজেপির পবন কুমার সিং। ২০২২ সালে অর্জুন সিং পুনরায় তৃণমূলে ফিরে আসেন।
বিধাননগর
২০১৬ সালে বিধাননগর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূলের হেভিওয়েট নেতা সুজিত বোস। ২০২১ সালেও সুজিত বোসই তৃণমূলের পতাকায় বিধাননগরের বিধায়ক পদে নির্বাচিত হন। হারিয়েছিলেন বিজেপির সব্যসাচী দত্তকে। পরে অবশ্য সবসাচী বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেন।
বনগাঁ উত্তর ও দক্ষিণ
২০১৬ সালে বনগাঁ উত্তর বিধানসভা থেকে জয়ী হন তৃণমূলের বিশ্বজিত দাস। এবং বনগাঁ দক্ষিণ থেকে জয়ী হন তৃণমূলের সুরজিৎ কুমার বিশ্বাস। ২০২১ সালে এই দুটি বিধানসভা কেন্দ্রেই ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। বনগাঁ উত্তর থেকে জয়ী হয়েছিলেন বিজেপির অশোক কীর্তনিয়া এবং বনগাঁ দক্ষিণ থেকে জিতেছিলেন বিজেপির স্বপন মজুমদার।
বসিরহাট উত্তর ও দক্ষিণ
বসিরহাট উত্তর থেকে ২০১৬ সালে জিতেছিলেন সিপিএম এর রফিকুল ইসলাম মণ্ডল। বসিরহাট দক্ষিণ থেকে জিতেছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের দীপেন্দু বিশ্বাস। ২০২১ সালে বসিরহাট উত্তর আসন এবং জয়ী প্রার্থী ধরে রাখতে ব্যর্থ হয় সিপিআইএম। জিতেছিলেন তৃণমূলের রফিকুল ইসলাম মণ্ডল। বসিরহাট দক্ষিণ আসন থেকে জয় পান তৃণমূল কংগ্রেসের সপ্তর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায়।
দমদম ও দমদম উত্তর
২০১৬ সালে দমদম উত্তর থেকে জয়ী হয়েছিলেন সিপিএম এর তন্ময় ভট্টাচার্য এবং দমদম বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূলের ব্রাত্য বসু। ২০২১ সালে দমদম উত্তর আসনটি হারায় সিপিএম। এই কেন্দ্র থেকে বিধায়ক পদে নির্বাচিত হন তৃণমূলের চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য্য এবং দমদম কেন্দ্র থেকে পুনরায় বিধায়ক পদে নির্বাচিত হন ব্রাত্য বসু।
হাবরা
২০১৬ এবং ২০২১ সালে হাবরা কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূলের হেভিওয়েট নেতা জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক।
নৈহাটি
নৈহাটি কেন্দ্র থেকে ২০১৬ এবং ২০২১ সালে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূলের পার্থ ভৌমিক। এরপরে ২০২৪ সালে পার্থ ভৌমিক সাংসদ পদে নির্বাচিত হলে এই কেন্দ্রে উপনির্বাচন হয়। জয় পান তৃণমূলের সনৎ দে।
রাজারহাট গোপালপুর
২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রাজারহাট গোপালপুর কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূলের পূর্ণেন্দু বসু। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় তিনি কৃষিমন্ত্রী, শ্রমমন্ত্রী, কারিগরি শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০২১ সালে তাঁর কেন্দ্র থেকে জয়ী হন তৃণমূলের অদিতি মুন্সি।
রাজারহাট নিউ টাউন
রাজারহাট নিউটাউন বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ২০১৬ সালে জেতেন তৃণমূলের সব্যসাচী দত্ত। ২০২১ সালে এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হন তৃণমূলের তাপস চট্টোপাধ্যায়। ২০১৬ সালের জয়ী বিধায়ক সব্যসাচী দত্ত বিজেপিতে যোগ দেন। এবং ২০২১ এর বিধানসভায় বিধাননগর থেকে তৃণমূলের সুজিত বোসের বিরুদ্ধে ভোটে লড়েন এবং হারেন।
কামারহাটি
২০১৬ সালে কামারহাটি কেন্দ্র থেকে জয়ী হন সিপিএম এর মানস মুখোপাধ্যায়। হারিয়েছিলেন তৃণমূলের প্রভাবশালী নেতা মদন মিত্রকে। ২০২১ সালে অবশ্য এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হন মদন মিত্র।
খড়দহ
২০১৬ সালে খড়দহ আসন থেকে জয়ী হন তৃণমূল কংগ্রেসের অমিত মিত্র। ২০২১ সালে এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হন তৃণমূলের কাজল সিনহা। কিন্তু ২০২১ সালে নির্বাচনের ফল প্রকাশের আগেই করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান কাজল সিনহা। এই কেন্দ্রে পুনরায় নির্বাচন হয়। উপনির্বাচনে জেতেন তৃণমূলের শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। যদিও ২০২১ সালের নির্বাচনে ভবানীপুর কেন্দ্র থেকে জিতেছিলেন শোভনদেব। কিন্তু সেখানকার বিধায়ক পদ তাঁকে ছাড়তে হয়।
সন্দেশখালি
২০১৬ সালে সন্দেশখালি বিধানসভা থেকে জয়ী হন তৃণমূল কংগ্রেসের সুকুমার মাহাতো। ২০২১ সালেও এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হন সুকুমার মাহাতো।
বিধানসভা এবং লোকসভার ইস্যু ভিন্ন প্রকৃতির। চলুন দেখে নেওয়া যাক বিগত দুটি লোকসভা নির্বাচনে পাল্লা ভারি কোন দিকে?
লোকসভার হিসেব
উত্তর ২৪ পরগনায় মোট পাঁচটি লোকসভা কেন্দ্র রয়েছে। বনগাঁ ,বসিরহাট, বারাসত. ব্যারাকপুর, দমদম বনগাঁ লোকসভা কেন্দ্র থেকে ২০১৯ এবং ২০২৪ সালে জয়ী হয়েছিলেন বিজেপির শান্তনু ঠাকুর। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্রে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূলের নুসরাত জাহান রুহি ২০২৪ সালে এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন হাজি নুরুল ইসলাম। ২০১৯ ও ২০২৪ সালে বারাসত লোকসভা কেন্দ্রে জয়ী হয়েছেন তৃণমূলের ডা. কাকলি ঘোষ দস্তিদার। ২০১৯ সালে ব্যারাকপুর লোকসভা কেন্দ্রে জয়ী হয়েছিলেন ভারতীয় জনতা পার্টির অর্জুন সিং। ২০২৪ সালে এই লোকসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের পার্থ ভৌমিক। ২০১৯ এবং ২০২৪ সালে দমদম লোকসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূলের হেভিওয়েট প্রার্থী সৌগত রায়।
উত্তর ২৪ পরগনার জনগনের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চল এবং সীমান্তের কিছু অংশে বিজেপির শক্তি রয়েছে। কিন্তু জেলার অধিকাংশ অঞ্চলেই ঘাসফুলের পতাকা উড়ছে। ২০১৯ সালে উত্তর ২৪ পরগনার দুটি লোকসভা আসনে বিজেপির পতাকা উড়লেও ২০২৪ এ একটি হারিয়েছে। মোটের ওপর উত্তর ২৪ পরগনা তৃণমূলের শক্ত ঘাটি, তা বলাই যায়।
এবারের ভোট ইস্যু
কখনও এসআইআর কখনও সিএএ। জেলার মানুষ ভুগছে অনুন্নয়ন নিয়ে, পেশা নিয়ে, যদিও একটি অংশ খুশি তাঁদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায়। এবারে বিধানসভা নির্বাচনে ঠিক কোন কোন ইস্যুর ওপর ভিত্তি করে জনগন তাদের পতাকা বেছে নেবে চলুন দেখে নেওয়া যাক।
উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ, গাইঘাটা, এবং হরিণঘাটা এলাকায় মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন কার্যকর হলেও, মতুয়াদের একটি বড় অংশ তাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতির বিষয়ে এখনও সন্দিহান, যা ভোটের একটি বড় ইস্যু। ২০২৬ সালের প্রাক-নির্বাচনী ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় বহু ভোটারের নাম বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। উত্তর ২৪ পরগনায় প্রধান সমস্যা অবশ্যই সীমান্ত। অনুপ্রবেশের ফলে এলাকার ডেমোগ্রাফিক্যাল চেঞ্জ এসেছে। অতিরিক্ত জনসংখ্যা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে রাস্তা, নিকাশি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। এছাড়াও সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান এবং অনুপ্রবেশ নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অস্থিতিশীলতা জনগনকে বিরক্ত করেছে। উত্তর ২৪ পরগনার একটি অংশ শিল্পাঞ্চল। সে অঞ্চলেও ক্রমসংস্থানের অভাব এবং জনঘনত্বের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সমস্যা প্রবল। সুন্দরবন এলাকার মৎস্যজীবীরা ট্রলার চালনার জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস ও জ্বালানির অভাব বর্তমানে একটি বড় সমস্যা। জেলার গ্রামীণ অংশে কৃষিজমিতে ভূগর্ভস্থ জলের দূষণ এবং মৎস্যচাষে সমস্যার খবর পাওয়া গেছে। এই জেলায় রাজারহাটের মতো উন্নত ব্লকের পাশাপাশি হারোয়া এবং মিনাখাঁর মতো অনগ্রসর ব্লকের মধ্যে ব্যাপক সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্যও দৃশ্যমান।
খাতায় কলমের বিশ্লেষণে ভোট হয় না। এটি একটা স্পেকুলেশন। উত্তর ২৪ পরগনার মানুষ কাদের বেছে নেবেন তা সময় বলবে। নজর রাখুন দ্বিতীয় দফার ভোটে