অসীম সেন: মেঘে ঢাকা তারা সিনেমার নীতা। আমরা দেখেছি তার জীবন সংগ্রাম। কিন্তু উদ্বাস্তু জীবনের পিছনের কারণটা কেমন করে যেন চাপা পড়ে গেল ইতিহাসের অন্ধকারে। আমরা জেনে এসেছি ১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগ একটি অন্ধক...
অসীম সেন: মেঘে ঢাকা তারা সিনেমার নীতা। আমরা দেখেছি তার জীবন সংগ্রাম। কিন্তু উদ্বাস্তু জীবনের পিছনের কারণটা কেমন করে যেন চাপা পড়ে গেল ইতিহাসের অন্ধকারে। আমরা জেনে এসেছি ১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগ একটি অন্ধকার অধ্যায়। আর সেই অধ্যায় লেখা হয়েছে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সমর্থনে। কিন্তু মূল ইতিহাস কি এতটাই সরল। এর বাইরে প্রশ্ন উঠলেই একটা অস্পষ্ট দাঙ্গার ইতিহাসকে সযত্নে লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা হয়, হয়ে এসেছে।
২০১৪ সালে পশ্চিমবঙ্গ দিবস উদ্যাপনের আগ্রহ তৈরি হয়। ২০২১ সাল থেকে এর নেতৃত্ব দেন তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তড়িঘড়ি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পয়লা বৈশাখকে রাজ্য দিবস ঘোষণা করে দেন। বার্তা স্পষ্ট, ২০ জুন-এর ইতিহাসকে কোনওভাবেই প্রকাশ্যে আনা যাবে না। তবে সত্য কে ধামাচাপা দেওয়া বোধহয় অতটা সহজ নয়। প্রথমেই একটা বিষয় বলে রাখা দরকার, বাংলার ভাগ বাটোয়ারা নেহাতই একটি ভৌগলিক ভাগ নয়, এটি হিন্দু বাঙালিদের টিকে থাকার ভাবনা।
১৯৪৭ সাল, ভারত ভাগের পর্ব। অবিভক্ত বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান চেয়েছিল পাকিস্তানের অংশ হতে। ততদিনে কলকাতার বুকে দগদগে ঘায়ের মত ঘটে গেছে বীভৎস দাঙ্গা। নোয়াখালিতে ঘটে গেছে হিন্দু গণহত্যা। মুসলিম শাসিত বাংলা, বাঙালিদের কাছে অভিশাপের সমান হয়ে উঠেছিল। শ্যামাপ্রসাদের নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গকে হিন্দুর বাসভূমি তৈরির জন্য এগিয়ে এলেন স্যর যদুনাথ সরকার, রমেশচন্দ্র মজুমদার, ভাষাবিদ সুনীতি চট্টোপাধ্যায়, বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা, মতুয়া গুরু প্রমথরঞ্জন ঠাকুরের মত মনীষীরা। সমর্থন করেছিল বাংলার কংগ্রেস। বাংলা বিভাজনের জন্য হিন্দু জনসভা অনুষ্ঠিত হল। ডা বিধানচন্দ্র রায়, ড প্রমথনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত মানুষেরা সমর্থন করলেন শ্যাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে। শুধু তাই নয় ১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগে অবিভক্ত বাংলার কমিউনিস্টরা প্রথমে অখণ্ড ও স্বাধীন বাংলার প্রস্তাবকে সমর্থন করলেও, পরবর্তীতে তারা পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থ রক্ষায় অখণ্ড ভারতের অংশ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পক্ষে অবস্থান নেন।
আলোচনার সুর কেটে আর একটা বিষয় উপস্থাপন করা যাক। কেন হিন্দুদের জন্য পশ্চিমবঙ্গ এতটা জরুরী? ১৯৫১ সালের জনগণনায় পশ্চিমবঙ্গে মুসলমান ছিল ১৯ শতাংশ। পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দু ছিল ২২ শতাংশ। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে মুসলমান ৩০ শতাংশ, বাংলাদেশে হিন্দু দাঁড়িয়েছে সাত শতাংশে। ১৯৪৭ সালের ২০ জুন বঙ্গীয় আইনসভা বাংলা ভারত বা পাকিস্তানের যোগদানের প্রশ্নে একমত হল না। হিন্দুপ্রধান অঞ্চল নিয়ে হল পশ্চিমবঙ্গ আইন সভা ও মুসলমানপ্রধান অঞ্চল নিয়ে হল পূর্ববঙ্গ আইন সভা। পশ্চিমবঙ্গ আইনসভার সদস্যরা ৫৮-২১ ভোটে বাংলা ভাগের পক্ষে ও পাকিস্তানে যোগদানের বিপক্ষে ভোট দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ গঠন সুনিশ্চিত করেন।
এরপর ৩ জুলাই ১৯৪৭, পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হন প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন করতে একটা গোষ্ঠীর ভারি অসুবিধা। আমরা ভুলে গিয়েছি পশ্চিমবঙ্গ মানে হিন্দু বাঙালির সুরক্ষিত জায়গা। এটা তো অস্বীকার করা যায় না পশ্চিবঙ্গ সৃষ্টি হয়েছিল ধর্মীয় জনসংখ্যার ভিত্তিতে অঞ্চল বিভাজনের মধ্য দিয়ে। বিগত সরকারের দুর্বল নীতির জন্য পশ্চিমবঙ্গে চলতে থাকল অনুপ্রবেশকারীর প্লাবন। একের পর এক মৌলবাদী আক্রমণে হিংসায় পশ্চিমবঙ্গ রক্তাক্ত। পশ্চিমবঙ্গ ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল পশ্চিম বাংলাদেশ হওয়ার দিকে।
তাই এখন ২০ জুনকে আবার গুরুত্ব দেবার সময় হয়ে গিয়েছে। হোমল্যান্ড না থাকলে উদ্বাস্তুরা হারিয়ে যায়। যেমন, ধনী উদ্বাস্তু পারসি বা সিন্ধিরা হারিয়ে যাচ্ছে, কাশ্মীরি হিন্দু উদ্বাস্তুরা হারাচ্ছে তাদের ভাষা, সংস্কৃতি। পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন শুধু ইতিহাস চর্চা নয়, পশ্চিমবঙ্গকে পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম। তাই বদলাক চিত্র। পশ্চিমবঙ্গ দিবসে গাওয়া হোক বন্দেমারতম। হিন্দু- মুসলিম ভাই ভাই। কিন্তু সেই ধারণা থাকা উচিত দু পক্ষেরই।