অসীম সেন: ঘর ছিল, বাড়ি ছিল, সংসারে আদরের ভাত ছিল। কিন্তু সবার কপালে তো আর সবকিছু জোটে না। পুকুর পারের কচু ঝোঁপের আড়াল থেকে কেনারাম অধিকারী দেখলেন তাঁর শান্তিকুঞ্জে আগুন লাগিয়েছে লালমুখো ইংরেজ পুলিশ।...
অসীম সেন: ঘর ছিল, বাড়ি ছিল, সংসারে আদরের ভাত ছিল। কিন্তু সবার কপালে তো আর সবকিছু জোটে না। পুকুর পারের কচু ঝোঁপের আড়াল থেকে কেনারাম অধিকারী দেখলেন তাঁর শান্তিকুঞ্জে আগুন লাগিয়েছে লালমুখো ইংরেজ পুলিশ। একবার নয় ১৯২৯ থেকে ১৯৪৩ সালের মধ্যে তিন তিনবার একই দৃশ্য দেখতে হয়েছিল কেনারাম অধিকারীকে। লবন সত্যাগ্রহ আন্দোলনে জেল খাটতে হয়েছিল কেনারাম অধিকারীকে। অনেক প্রলোভন এসেছিল কিন্তু শিরদাঁড়া বিক্রি হয়নি কখনও। ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় কাঁথিতে যে তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার গঠিত হয়েছিল, সেই সময় অধিকারী পরিবার ওই অঞ্চলের মুক্তি সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিল। স্ত্রী কাদম্বিনীকে কথা দিয়েছিলেন ইতিহাস মনে রাখবে। ইতিহাস মনে রেখেছে কাঁথির কারকুলি গ্রামের বীর সন্তানকে।
কেনারাম অধিকারীর ছেলে শিশির অধিকারী, নাতি শুভেন্দু অধিকারী। শুধু নামই যথেষ্ট। শুভেন্দু অধিকারী এমন একটা নাম, যে নাম প্রবল প্রতাপী লক্ষ্মণ শেঠকে উপড়ে ফেলেছিল নিজের জমি থেকে। এই নাম দুই দুইবার মাটিতে মিশিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এভারেস্ট সমান গর্বকে। যার ডাকে সারা দিয়ে ছোট আর বড় দুইবোন মুখ ফিরিয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর। ২০২১ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধীদলের অন্যতম মুখ ছিলেন শুভেন্দু অধকারী। দায়িত্ব পালন করেছেন বিরোধী দলনেতা হিসেবে। পূর্ব মেদিনীপুরের অধিকারী পরিবারের ঐতিহ্য এবং পরবর্তীতে রাজ্যে ক্ষমতার সমীকরণ উভয়ই তাঁর ধমনীতে বহমান । একটা সময় লাল সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। ২০০৭-২০০৮ সালে নন্দীগ্রামের জমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলনে তিনিই ছিলেন মুখ্য ভূমিকায়। ২০০৬-২০০৯ সাল পর্যন্ত কাঁথি দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক ছিলেন এবং পরবর্তীতে তমলুক লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু যে আদর্শের হাত ধরে বাম অচলায়তনকে সরিয়েছিলেন। কেমন করে যেন বদলে গেল সেই আদর্শ।
রাজ্যের ভালোর ক্ষেত্রে কোনওদিন সমঝোতা করেননি শুভেন্দু অধিকারী। ২০২০ সালের শেষের দিকে তিনি তৃণমূল কংগ্রেস ত্যাগ করে ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগদান করেন। মুখ্যমন্ত্রীর ছোটবোন নন্দীগ্রামে হারিয়েছিলেন ২০২১ সালে। লোর্ডশেডিং তত্ত্ব খাড়া করে বড় বোন ভবানীপুরে সাপ্লিমেন্ট পাশ করে কোনও ভাবে মুখ বাঁচিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। এবার সেটুকুও সম্মান রইল না। ভবানীপুরের মানুষ মাটিতে আছড়ে ফেলল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। আজ শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক জীবনের একটি বৃত্ত সম্পূর্ণ হল। তবে এখনও তিনি আদ্যোপান্ত একজন কৃষ্ণভক্ত । এখনও মানুষের জন্য মাটির কাছে পাওয়া যায় তাঁকে। এখনও বিপ্লবের মুখ হয়েই বেঁচে থাকতে ভালোবাসেন শুভেন্দু অধিকারী।