কমিশনের নির্দেশে পুলিস ৮০০ জন তৃণমূল কর্মীকে গ্রেফতার করতে পারে, এই আশঙ্কা নিয়ে সোমবার কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন তৃণমূল সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল সেই মামলা দায়েরের অনুমতি দেন। এবং, দ্রুত শুনানির আশ্বাস পাওয়া যায় আদালত থেকে।
এদিন এই মামলার শুনানি হয় হাইকোর্টে। দু-পক্ষের সওয়াল-জবাব চলে। শেষে, কমিশনের আইনজীবী জানান, মামলাকারী যে-যুক্তি দিয়েছেন, তার উত্তর দিতে ৭ দিন সময় লাগবে তাঁদের। আদালত তা মেনে নেয়। এবং, সেই মতো পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয় আগামী সোমবার। তবে, আদালত জানিয়েছে, গণহারে গ্রেফতারি নয়, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তবেই পদক্ষেপ করা যাবে।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ইতিমধ্যেই কমিশনের নির্দেশে ধরপাকড় চলছে। গ্রেফতারিও চলছে। এমতাবস্থায়, ৭ দিনের মধ্যে যা করার তা করে ফেলবে কমিশন। তারপর রক্ষাকবচ পেয়েও কোনও সুরাহা হবে না। প্রসঙ্গত, ২৯ তারিখেই দ্বিতীয় দফা তথা শেষ দফার ভোট 'শেষ' হচ্ছে।
মামলার ইতিবৃত্ত
জাতীয় নির্বাচন কমিশন রাজ্য পুলিসের মাধ্যমে বিধানসভা ধরে-ধরে তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীদের নাম নিয়েছে এবং সেই সংখ্যা ৮০০-র কাছাকাছি বলে দাবি করে সোমবার কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন তৃণমূল সাংসদ ও আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের এজলাসের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। মামলা দায়ের অনুমতি দেওয়া হয়। এবং, দ্রুত শুনানির আবেদন কার্যত মঞ্জুর করা হয়।
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় মামলা দায়ের করার পর কমিশন-সূ্ত্রে জানা যায়, সংখ্যাটা ৮০০ নয়, ৪ হাজার! তবে, বেছে-বেছে তৃণমূল কর্মীদের গ্রেফতারে দাবি ভিত্তিহীন বলে জানায় কমিশন।
এদিন দু-পক্ষের সওয়াল-জবাব
আবেদনকারী আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এদিন প্রধান বিচারপতির এজলাসে সওয়াল করে বলেন, রাজ্যের বিভিন্ন বিধানসভার সক্রিয় তৃণমূল নেতা ও কর্মীদের নাম কমিশন-নির্দিষ্ট দাগি অপরাধীদের তালিকায় রয়েছে। তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন কাউন্সিলর ও পৌরসভার চেয়ারম্যান! তাঁরা কেউ অপরাধী নন। কোথাও তাঁদের নাম 'বৈধ অভিযোগ' নেই । অথচ যাঁরা তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে গেছেন, তাঁদের নামে একাধিক অভিযোগ থাকলেও দাগি অপরাধীদের তালিকায় তাঁরা কিন্তু নেই। ক্ষমতার অপব্যবহর করছে নির্বাচন কমিশন।
রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল কিশোর দত্ত সওয়াল করে বলেন, সাধারণভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনও রাজ্যের হাতে। যদিও পুলিশ এখন কমিশনের আওতাধীন। রাজ্য সরকার আবেদনকারীর আবেদন (দানিশ ফারুখের জনস্বার্থ মামলা) সমর্থন করছে। ট্রাবল মেকার বলে আইনে কোনও শব্দ নেই। কোনও ব্যক্তি তখনই অপরাধী বলে স্বীকৃত হয় যখন তার নামে কোনো বৈধ অভিযোগ দায়ের হয় ।
নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী দামা শেষাদ্রি নাইডু সওয়াল করে বলেন, কমিশন কাউকে গ্রেফতার করতে নির্দেশ দেয়নি। আমরা চরম পরিস্থিতির কথা ভেবেই যা বলার বলেছি। যদি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পথে কেউ বাধা হয় তখন প্রয়োজনে ব্যাবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
তৃণমূলের ভয় কেন?
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ভোটের দিন বা তার আগে এলাকার কোনও কুখ্যাত মুখ যাতে কোনওরকম গোল বাধাতে না-পারে, সেই মর্মে তাদের চিহ্নিত করে গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। আগে যাকে বলা হত, 'প্রিভেনটিভ ডিটেনশন'। সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, শুধু এবাবের ভোটেই নয়, যে কোনও সাধারণ নির্বাচনের আগে এই ধরনের আটক করা হয়ে থাকে। এবার কমিশন একটু কড়া পদক্ষেপ করছে, এই যা। তবে পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ বলছেন, সাধারণ নির্বাচনের আগে 'প্রিভেনটিভ ডিটেনশন'-এ শাসকদল আশ্রিত দুষ্কৃতীদের বদলে বিরোধী কর্মীদেরই বেশি আটক করা হয়। এবার সে গুড়ে বালি। সেই কারণেই প্রথম দফার ভোটের আগে তড়িঘড়ি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
রাজনৈতিক মহলের একাংশ বলছে, এবার কিন্তু কমিশনের দাওয়াই দারুণ কাজ করছে। রাজ্য পুলিস ভয়ানকরকম সক্রিয় হয়েছে। রবিবারই আসানসোলে বিজেপি কর্মীদের উপর হামলার অভিযোগ আসায়, তৃণমূলের পার্টি অফিসের ভিতর ঢুকে গিয়ে অ্যাকশন চালিয়েছে পুলিস। সঙ্গে থেকেছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। একেবারে ঘাড় ধরে এক-এক করে পুলিসের গাড়িতে তোলা হয়েছে তাঁদের। কমবেশি সর্বত্রই একই অবস্থা। সবং-এ বিরোধীদের ধমক-চমক দেওয়ার অভিযোগ পেয়ে, এক তৃণমূল কর্মীকে ডেকে, ছবি দেখিয়ে চিহ্নিত করে, বাহিনীর এক আধিকারিক বিরাশি সিক্কার থাপ্পড় কষিয়েছেন। এবং, সেই ভিডিয়ো ভাইরালও হয়েছে। বিধাননগরে 'সুজিত-ঘনিষ্ঠ' তৃণমূল নেতা নির্মল দত্তকে গ্রেফতার করা হয় দিন-পাঁচ-ছয় আগে। অভিযোগ, ভোটারদের ধমক-চমক দিচ্ছিলেন তিনি। প্রসঙ্গত, বিধাননগরই সুজিত বসুর বিধানসভা কেন্দ্র।