বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই উত্তরবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক জমি ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়েছে। দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার— একের পর এক জেলায় সংগঠনের ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। সাংসদদের একাংশ বিদ্রোহী শিবিরে, বিধায়কদের মধ্যেও ভাঙন। এই আবহে উত্তরবঙ্গে দলের শেষ শক্ত ঘাঁটি হিসেবে ধরা হচ্ছিল শিলিগুড়ি পুরনিগমকে। কিন্তু সেই দুর্গেও এবার বড়সড় ধাক্কার ইঙ্গিত মিলল।
শুক্রবার সকালে শিলিগুড়ি পুরনিগমের মেয়র পদ থেকে ইস্তফা দিলেন গৌতম দেব। তিনি পুর কমিশনারের কাছে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। সম্প্রতি তাঁকে তৃণমূলের দার্জিলিং জেলা (সমতল) সাংগঠনিক কমিটির চেয়ারম্যান করা হয়েছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, সংগঠনকে পুনর্গঠনের দায়িত্ব আরও সক্রিয়ভাবে পালন করতেই তিনি প্রশাসনিক পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তবে এই পদত্যাগ ঘিরে জল্পনা থামছে না। কারণ, শিলিগুড়ি পুরবোর্ডের মেয়াদ এখনও এক বছরেরও বেশি বাকি। বৃহস্পতিবার মেয়র পারিষদদের নিয়ে বৈঠকে গৌতম দেব নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানালে তা নিয়ে মতপার্থক্য তৈরি হয়। একাংশ চাইছিলেন তিনি পদে বহাল থাকুন, অন্য অংশ আবার নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু সব বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন গৌতম।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পদত্যাগ শুধু একজন মেয়রের প্রশাসনিক দায়িত্ব ত্যাগ নয়, বরং উত্তরবঙ্গে তৃণমূলের সাংগঠনিক সংকটের প্রতীকও বটে। কারণ, শিলিগুড়ি পুরনিগম হারালে উত্তরবঙ্গে কার্যত কোনও উল্লেখযোগ্য প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক ঘাঁটি আর অবশিষ্ট থাকবে না দলের। একসময় উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী মুখ ছিলেন গৌতম দেব। ২০১১ সালে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তরের দায়িত্ব পান, পরে পর্যটনমন্ত্রীও হন। কিন্তু ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি এবং ২০২৬ সালে শিলিগুড়ি কেন্দ্র থেকে পরাজয়ের মুখ দেখতে হয় তাঁকে। যদিও ২০২২ সালে তাঁর নেতৃত্বেই শিলিগুড়ি পুরনিগমে জয় পেয়েছিল তৃণমূল।
এখন প্রশ্ন একটাই— গৌতম দেবের এই পদত্যাগ কি শুধুই সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি, নাকি উত্তরবঙ্গে তৃণমূলের দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের শেষ পর্বের সূচনা? আগামী কয়েক সপ্তাহের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহই হয়তো তার উত্তর দেবে।