অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট সুনিশ্চিত করতে কোথাও এতটুকু ফাঁক রাখতে চাইছে না নির্বাচন কমিশন। এবং, তার সর্বশেষ ও সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হল, রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতরেও আমলা বদল!
ধাপে-ধাপে রদবদল
রাজ্যে ভোট ঘোষণার অব্যবহিত পরেই নজিরবিহীনভাবে মুখ্যসচিবকে সরিয়ে দেয় কমিশন। সেই সঙ্গে সরিয়ে দেওয়া হয় স্বরাষ্ট্রসচিবকেও। এরপর দফায়-দফায় পুলিস কর্তা ও আমলাদের সরানো হয়। যাঁদের মধ্যে ১১ জন জেলা শাসক রয়েছেন।
এই ঘটনায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক্সপোস্ট করে লেখেন, যেভাবে শীর্ষস্থানীয় ৫০ জন আধিকারিককে অপসারিত করেছে নির্বাচন কমিশন, তা আদতে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং চূ়ড়ান্ত পর্যায়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। এবং, ফের একবার দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পত্রাঘাত করেন তিনি। এমতাবস্থায়, ইন্ডিয়া জোটের অন্যতম দুই শরিক, আপ-এর অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও ন্যাশানাল কনফারেন্সের ওমর আবদুল্লাহ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দাঁড়ান।
বিডিও বদল
এর পরের ধাপে, ১৭ টি জেলার ৮৩ জন বিডিও-কে বদলি করে কমিশন।
কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী থেকে শুরু করে বিরোধীদের অনেকেই এতদিন দাবি করে আসছিলেন, "এসপি নন, ভোট করান আইসি-রা"। তাই থানাস্তরে বদল না-হলে অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোট কখনওই সম্ভব নয়। এমতাবস্থায়, বিরোধীদের অভিযোগ সিলমোহর দিয়ে থানাস্তরে ১৪২ জন আধিকারিককে বদল করল কমিশন। এখনও অবধি তালিকায় যাঁদের নাম রয়েছে, মোটের ওপর তাঁরা সবাই ইনস্পেক্টর পদমর্যাদার আধিকারিক। যাঁরা বিভিন্ন থানার ওসি বা আইসি পদের দায়িত্ব রয়েছেন। শুধু তা-ই নয়। পর্যবেক্ষকদের কাছে যা আরও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে, এই বদলের তালিকায় যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁদরে মধ্যে অনেকেই সিআইডি বা আইবি-তে কোনও-না-কোনও দায়িত্বে রয়েছেন। অবসরপ্রাপ্ত পুলিস কর্তাদের কেউ কেউ বলছেন, ভোটের আগে পাবলিক-পালস বুঝতে গোয়েন্দাগিরির করে সরকারকে রিপোর্ট দেন আইবি ও সিআইডি-র আধিকারিকরাই।
কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ পর্যন্ত রাজ্যের বিভিন্ন জেলা পুলিস ও পুলিস জেলায় এই রদবদল হয়েছে। এই বদলের তালিকায় রয়েছেন কলকাতা পুলিসের ইনস্পেক্টর পদমার্যাদার ৩১ জন। যাঁরা কলকাতার বিভিন্ন থানার ওসি বা 'বড়বাবু'।
সর্বশেষ আপডেট
রাজ্যের উপ মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক কার্য সুব্রত পাল-সহ বেশ কয়েকজনকে বদল করা হল সোমবার। যদিও, মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের পদে বহাল রয়েছেন মনোজ আগরওয়াল। পর্যবেক্ষকরা অবশ্য বলছেন, বদলি মানেই তাঁদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে তা না-ও হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই, ওই পদে আরও যোগ্য কোনও আধিকারিককে নিয়োগ করতেই কমিশন এই ধরনের বদল করে থাকে।
'অহিংস ও ভয়শূন্য' ভোট
দুদিনের বঙ্গসফরে এসে, দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার খুব তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে বলেছেন, "রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের তপোভূমিতে দাঁড়িয়ে নির্বাচন কমিশন আবারও পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি ভোটারকে বার্তা দিতে চায়, নির্বাচন হবে অহিংস (Violence Free) এবং ভয়শূন্য (Intimidation Free)"। পর্যবেক্ষকরা গুরুত্ব দিচ্ছেন দ্বিতীয়টির উপর। যে-চোখরাঙানি চোখে দেখা যায় না, যে-হুমকি কানে শোনা যায় না, একেবারে ঠিক সেই জায়গাতেই জোর দিয়েছেন তিনি: 'ইন্টিমিডেশন ফ্রি (Intimidation Free)'। বুথের ভিতর যতটা নজর কমিশনের, ঠিক ততটাই নজর বুথের বাইরে। রাজ্যের আমলা ও পুলিস কর্তাদের স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছেন জ্ঞানেশ কুমার, শুধু ভোটের দিন কোথাও কোনও রক্তপাত হবে না, তা নয়, 'নিঃশব্দ অদৃশ্য সন্ত্রাস'ও এবার আর বরদাস্ত করা হবে না। রাজ্যের এডিজি (আইন-শৃঙ্খলা) বিনীত গোয়েলকে ধমক দিয়ে তিনি বলেছেন, "সব জানি, বসুন"। বেশ কয়েকজন জেলাশাসককে সতর্ক করে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, সব কাজের 'ডিজিটাল ফুট প্রিন্ট' রয়েছে ও রয়ে যাবে, তাই, বেচাল দেখলে ভোট-পর্ব শেষ হওয়ার পরেও পদক্ষেপ করবে কমিশন।
নিশ্ছিদ্র লোহার বাসর
চাঁদ বণিক তাঁর পুত্রের জন্য নিশ্ছিদ্র লোহার বাসর তৈরি করেছিলেন। যদিও, সেই নিশ্ছিদ্র লৌহবাসরেও ছিদ্র খুঁজে পেয়ে ঢুকে পড়েছিল সাপ। প্রশ্ন, ছাব্বিশের বিধানসভায় এতকিছুর পরও, শেষ অবধি, কোনও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ছিদ্র থেকে যাবে না তো?