মুন্নি চৌধুরী: বারুইপুরের ১২ বছরের নাবালিকার ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড শুধু একটি ফৌজদারি মামলা নয়, এটি গোটা রাজ্যের বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়া এক নির্মম ট্র্যাজেডি। এমন ঘটনার পরে রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিক্রিয়া যেমন ...
মুন্নি চৌধুরী: বারুইপুরের ১২ বছরের নাবালিকার ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড শুধু একটি ফৌজদারি মামলা নয়, এটি গোটা রাজ্যের বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়া এক নির্মম ট্র্যাজেডি। এমন ঘটনার পরে রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিক্রিয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মানবিক অবস্থান। সেই জায়গা থেকেই বারুইপুরে গিয়ে নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করে বিজেপি নেত্রী ও মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল যে বার্তা দিলেন, তা রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে গিয়েও আলোচনার দাবি রাখে।
পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন তিনি। তাঁদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন। প্রশাসন এই ঘটনায় প্রয়োজনীয় সমস্ত পদক্ষেপ করছে বলেও পরিবারকে আশ্বস্ত করেন। কিন্তু তাঁর সফরের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ ছিল সংবাদমাধ্যমের সামনে দেওয়া একটি সংক্ষিপ্ত মন্তব্য—"আমি রাজনীতি করতে আসিনি, একজন মা হিসেবে এসেছি। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক, সেটাই চাই।" এই একটি বাক্যই গোটা সফরের রাজনৈতিক তাৎপর্যকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
বাংলার রাজনীতিতে নারী নির্যাতনের ঘটনা বহুবার রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে। অভিযোগ-প্রত্যাঘাত, মিছিল, পাল্টা মিছিল—এসব নতুন কিছু নয়। কিন্তু সেই আবহে একজন রাজনৈতিক নেত্রী যদি নিজেকে প্রথমে "মা" হিসেবে পরিচয় দেন এবং বিচারকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার কথা বলেন, তবে তা নিঃসন্দেহে ভিন্ন ধরনের বার্তা বহন করে।
অগ্নিমিত্রা পালের রাজনৈতিক জীবনের দিকে তাকালেও এই অবস্থান একেবারে বিচ্ছিন্ন নয়। বিরোধী নেত্রী থাকাকালীন কাটোয়া, সন্দেশখালি, আরজি কর, কাকদ্বীপ-সহ একাধিক নারী নির্যাতনের ঘটনায় তাঁকে নির্যাতিতাদের পরিবারের পাশে দেখা গিয়েছে। সেই ধারাবাহিকতাই যেন বজায় রইল বারুইপুরেও। সরকারে থাকার পরও ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিবারের সঙ্গে দেখা করা এবং প্রকাশ্যে বিচার দাবি করা রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার একটি দিক তুলে ধরে।
অন্যদিকে, রাজ্য সরকারও ইতিমধ্যেই দ্রুত পদক্ষেপ করেছে। বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন হয়েছে, একাধিক অভিযুক্ত গ্রেফতার হয়েছে এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজে পরিবারের সঙ্গে কথা বলে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছেন। প্রশাসনিক পদক্ষেপের পাশাপাশি শাসকদলের প্রতিনিধিদের মাঠে নেমে পরিবারের পাশে দাঁড়ানো সরকারের অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করেছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখনও রয়ে গিয়েছে, বিচার কত দ্রুত এবং কতটা নিরপেক্ষ হবে? কারণ, কোনও সংবেদনশীল অপরাধে রাজনৈতিক সহানুভূতি যতই প্রকাশ করা হোক, শেষ পর্যন্ত মানুষের আস্থা তৈরি হয় আদালতের রায় এবং প্রশাসনের কার্যকারিতার উপরেই।
বারুইপুরের ঘটনা রাজনীতির নয়, মানবতার পরীক্ষা। সেখানে অগ্নিমিত্রা পালের "মা হিসেবে এসেছি" মন্তব্য নিঃসন্দেহে একটি আবেগঘন বার্তা। কিন্তু সেই বার্তার প্রকৃত মূল্য তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন তদন্ত দ্রুত শেষ হবে, অপরাধীরা আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি পাবে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মানুষ শেষ পর্যন্ত বক্তব্য নয়, ফলাফলই মনে রাখে। আর সেই ফলাফল যদি ন্যায়বিচার হয়, তবেই বারুইপুরের এই ক্ষত কিছুটা হলেও উপশমের পথে এগোবে।