মুন্নি চৌধুরী: বারুইপুরের ১২ বছরের নাবালিকার ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড শুধু একটি অপরাধের মামলা নয়, এটি গোটা বাংলার বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়া এক মর্মান্তিক ঘটনা। এমন ঘটনার পরে মানুষের প্রথম প্রত্যাশা, দ্রুত বিচার,...
মুন্নি চৌধুরী: বারুইপুরের ১২ বছরের নাবালিকার ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড শুধু একটি অপরাধের মামলা নয়, এটি গোটা বাংলার বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়া এক মর্মান্তিক ঘটনা। এমন ঘটনার পরে মানুষের প্রথম প্রত্যাশা, দ্রুত বিচার, কঠোর শাস্তি এবং নির্যাতিতার পরিবারের পাশে নিঃশর্তভাবে দাঁড়ানো। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, শোকের এই মুহূর্তেও রাজনৈতিক উপস্থিতি এবং জনতার প্রতিক্রিয়া নতুন এক বার্তা দিয়ে গেল।
ঘটনার তিন দিন পর কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের প্রতিনিধিরা যখন বারুইপুরে পৌঁছলেন, তখন তাঁদের সামনে ক্ষোভ উগরে দিলেন স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, শিউলি সাহা কিংবা পরে স্থানীয় সাংসদ সায়নী ঘোষ, কারও ক্ষেত্রেই জনতার প্রতিক্রিয়া খুব একটা ইতিবাচক ছিল না। ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’এই প্রশ্নই যেন সবচেয়ে জোরালো হয়ে উঠল। রাজনৈতিক স্লোগান নয়, মানুষের ক্ষোভই সেদিন সবচেয়ে বড় ভাষ্য হয়ে দাঁড়াল। পাশাপাশি কাউকে চোর, কাউকে গদ্দার, কাউকে বালিশ চাটা শুনতে হল,
গণতন্ত্রে যে কোনও রাজনৈতিক দলেরই দুর্গত পরিবারের পাশে যাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু সেই উপস্থিতি তখনই অর্থবহ হয়, যখন মানুষ মনে করেন সেটি আন্তরিকতার প্রকাশ। যদি মানুষের মনে এই ধারণা জন্মায় যে সহানুভূতির বদলে রাজনৈতিক উপস্থিতিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তাহলে সেই সফর প্রশ্নের মুখে পড়বেই। বারুইপুরে যা ঘটেছে, তা সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।
অন্যদিকে, বর্তমান সরকারের ভূমিকা নিয়ে আলোচনাও সমানভাবে সামনে এসেছে। ঘটনার পরপরই তদন্তে গতি আনা, বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন, একাধিক অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেফতার, নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর সরাসরি যোগাযোগ এবং দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির আশ্বাস, এই পদক্ষেপগুলি প্রশাসনের সক্রিয়তার একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। পরে বিজেপি নেত্রী লকেট চট্টোপাধ্যায় এবং মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল পরিবারের সঙ্গে দেখা করে সরকারের পক্ষ থেকে পাশে থাকার আশ্বাসও পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, নির্যাতিতার পরিবার প্রকাশ্যে তদন্তপ্রক্রিয়ার উপর আস্থা রেখেছে বলেই বিভিন্ন মহলে দাবি করা হচ্ছে। কোনও অপরাধের তদন্তে মানুষের এই আস্থা প্রশাসনের কাছে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বিচারপ্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও তা একটি ইতিবাচক দিক। বারুইপুরের ঘটনা আরও একটি বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। মানুষ এখন শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য শুনতে চান না; তাঁরা দেখতে চান কে কত দ্রুত কাজ করছে, কে সংকটের মুহূর্তে পাশে দাঁড়াচ্ছে এবং কে শুধুমাত্র ঘটনাকে রাজনৈতিক বিতর্কের উপকরণে পরিণত করছে। জনতার প্রতিক্রিয়াই বুঝিয়ে দিয়েছে, ভোটের রাজনীতির বাইরে মানুষের বিচার অনেক বেশি কঠোর।
তবে একটি বিষয় কখনও ভুলে গেলে চলবে না এই ঘটনায় মূল কেন্দ্রবিন্দু কোনও রাজনৈতিক দল নয়, নয় কোনও নেতার সফর। কেন্দ্রবিন্দু হল এক নিরীহ কিশোরীর অসমাপ্ত জীবন এবং তার পরিবারের বিচার পাওয়ার লড়াই। সেই বিচার দ্রুত, নিরপেক্ষ এবং দৃষ্টান্তমূলক হওয়াই এখন প্রশাসনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। শেষ পর্যন্ত বারুইপুরের এই ঘটনা রাজনীতির থেকেও বড় একটি বার্তা দিয়ে গেল—মানুষের আস্থা অর্জন করা যায় না শুধুমাত্র বক্তব্যে; তা অর্জন করতে হয় সময়মতো উপস্থিতি, কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং নিরপেক্ষ বিচারের মাধ্যমে। বাংলার মানুষ এখন সেই ফলাফলই দেখতে চাইছেন।