"আগে ছিল রিপোল ইজ এক্সসেপশন, এবার ডাউট মিনস রিপোর্ট", সাংবাদিক বৈঠকে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল। এবং, বিষয়টি ব্যাখ্যা দিয়ে বললেন, "অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট সুনিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন এবার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বুথের ভিতর চারজনের বেশি প্রবেশ নিষেধ। রাজ্যের ৮০ হাজার বুথের কোনও একটিতে যদি চারজনের বেশি লোক ঢুকে পড়ে, তাহলে সঙ্গে-সঙ্গে পপ-আপ দেবে এআই। সেই পপআপ দেখলেই তৎদণ্ডে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত কমিশনের আধিকারিকরা ঘটনাস্থলে চলে যাবেন। কেন্দ্রীয় বাহিনীও দ্রুত পদক্ষেপ করবে। প্রত্যেক বুথের অক্ষাংশ দ্রাঘিমাংশ, গুগল ম্যাপ, প্রিসাইডিং অফিসার, সব রয়েছে (সফটওয়্যারে)"। এরপর কমিশনের সাবধানবাণী, "কেউ গন্ডগোল করলে নিজের দায়িত্বে করবে"।
পুনর্নির্বাচন?
কমিশন এবার এতটুকু বেচাল দেখলে সংশ্লিষ্ট বুথের ভোট খারিজ করে পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ দেবে। রাজ্যের সিইও-র কথায়, "আগে রিপোল (পুনর্নির্বাচন) ছিল এক্সসেপশন, এবার এতটুকু সন্দেহ থাকলেই পুনর্নির্বাচন হবে"।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, রীতি অনুযায়ী, বিরোধীদের দাবির প্রেক্ষিতেই কোনও বিধানসভা (বা লোকসভা) কেন্দ্রের কোনও কোনও বুথে পুনর্নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। এবং, পুনর্বার সেই নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ সেভাবে চোখে পড়ে না। রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করে, বিরোধীদের দাবি মেনে, কার্যত ছাপ্পা-ভোটকে স্বীকৃতি দিয়ে কমিশন যখন পুনর্নির্বাচন করাচ্ছে, তখন সেই নির্বাচনের লাইনে দাঁড়ানো ভোটারদের সহজে বিরোধী-সমর্থক বলে চিহ্নিত করতে পারে শাসকদল। সেই ঝুঁকি অনেকেই নিতে চান না। এমতাবস্থায়, কমিশনের তরফ থেকেই যদি পুনর্নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে শাসক-বিরোধী দু-পক্ষের ভোটারই স্বচ্ছন্দে ভোটের লাইনে দাঁড়াতে পারবেন।
জ্ঞানেশের সেনানি মনোজ-সুব্রত
বাংলার 'ভোট কালচার' যে এবার পাল্টাবে তার আগাম ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল নির্বাচন কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্তের কথায়। কালীঘাট থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, "(ভোট) কালচার মানে কি বিজেপির ডান্স করা? উনি (সুব্রত গুপ্ত) এখানকার কালচার কী চেঞ্জ করবেন? বেঙ্গলের কালচার, বাংলার কালচার, বাংলাতেই থাকবে। উনি নিজের কালচার ঠিক করুন আগে"।
পরে যখন সাপ্লিমেন্টারি তালিকা নিয়ে সাংবাদিক বৈঠকে যখন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে বাংরবার আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়, তখন তার উত্তরে তিনি স্পষ্ট বুঝিয়ে দেন: ভোট এবার অন্যরকম হবে।
কীরকম ভোট হবে এবার?
রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল জানান, বুথের নিয়ন্ত্রণ থাকবে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানের হাতে। তাই ইভিএমে সেলোটেপ (হামেশাই যে-অভিযোগ ওঠে), ওয়েবকাস্টিং ক্যামেরায় চুইংগাম লাগানো সহজ হবে না"। বাহিনীকে তো পুলিস নিয়ন্ত্রণ করবে, তাহলে? এবার আরও স্পষ্ট উত্তর, "পুলিসের কাজ হবে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে সহায়তা করা। বুথের নিয়ন্ত্রণ আর পুলিসের হাতে থাকবে না। যাঁরা সীমান্তে সর্বদা পাহারা দিচ্ছেন, সেই জওয়ানদের কাছে একটা বুথ নিয়ন্ত্রণ করা কোনও ব্যাপারই নয়"।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, অনেক বুথে ইভিএমে এমনভাবে সেলোটেপ লাগিয়ে রাখা হয়, যাতে করে বিরোধী প্রার্থীর প্রতীকে বোতাম টেপাই সম্ভব না হয়। এবং, একমাত্র শাসকদলের প্রতীকে বোতাম টেপার সুযোগ থাকে। এমতাবস্থায়, যদি কেউ সেই বোতাম না-টেপেন, তাহলে সেই ভোটারকে আলাদা করে চিহ্নিত করা সহজ হয়। এবং, জলে থেকে কুমিরের সঙ্গে বিবাদে ক-জনই বা যেতে চান।
এছাড়াও, বুথের ভিতর যে-ক্যামেরা থাকে, যার মাধ্যমে ওয়েব কাস্টিং হয়, সেই ক্যামেরার মুখ ঘুরিয়ে রাখার অভিযোগ আসে আকছার। এমনকি, সেই ক্যামেরা বেশ কিছুক্ষণের জন্য বিকল করে দেওয়ার অভিযোগও কম নয়। এছাড়া চুইংগাম তো রয়েইছে। তবে এবার যে এগুলোর কোনওটাই হবে না, সুব্রত গুপ্তকে পাশে বসিয়ে তা একেবারে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলেন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল। এবং, অবশ্যই দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সেনানি হয়ে।
'অহিংস ও ভয়শূন্য' ভোট
দুদিনের বঙ্গসফরে এসে, দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার খুব তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে বলেছেন, "রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের তপোভূমিতে দাঁড়িয়ে নির্বাচন কমিশন আবারও পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি ভোটারকে বার্তা দিতে চায়, নির্বাচন হবে অহিংস (Violence Free) এবং ভয়শূন্য (Intimidation Free)"। পর্যবেক্ষকরা গুরুত্ব দিচ্ছেন দ্বিতীয়টির উপর। যে-চোখরাঙানি চোখে দেখা যায় না, যে-হুমকি কানে শোনা যায় না, একেবারে ঠিক সেই জায়গাতেই জোর দিয়েছেন তিনি: 'ইন্টিমিডেশন ফ্রি (Intimidation Free)'। বুথের ভিতর যতটা নজর কমিশনের, ঠিক ততটাই নজর বুথের বাইরে। রাজ্যের আমলা ও পুলিস কর্তাদের স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছেন জ্ঞানেশ কুমার, শুধু ভোটের দিন কোথাও কোনও রক্তপাত হবে না, তা নয়, 'নিঃশব্দ অদৃশ্য সন্ত্রাস'ও এবার আর বরদাস্ত করা হবে না। রাজ্যের এডিজি (আইন-শৃঙ্খলা) বিনীত গোয়েলকে ধমক দিয়ে তিনি বলেছেন, "সব জানি, বসুন"। বেশ কয়েকজন জেলাশাসককে সতর্ক করে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, সব কাজের 'ডিজিটাল ফুট প্রিন্ট' রয়েছে ও রয়ে যাবে, তাই, বেচাল দেখলে ভোট-পর্ব শেষ হওয়ার পরেও পদক্ষেপ করবে কমিশন।