অনুমতি মিলল। তবে শর্তসাপেক্ষে।
দোলযাত্রার পর থেকেই জনসংযোগের মাধ্যম হিসেবে বিধানসভা ধরে-ধরে রথযাত্রা তথা সংকল্পযাত্রা শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বঙ্গ-বিজেপি। এই রথযাত্রাকে কীভাবে লোকারণ্য করে তোলা যায়, তার কলা কৌশল ঠিক করতে সল্টলেকের একটি হোটেলে বিজেপির হাইপ্রোফাইল এক বৈঠকও হয় চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের ১৭ তারিখ। কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধার দিক কীভাবে দেড়-দুমাসের অল্প সময়ের মধ্যে রাজ্যের প্রতিটি বিধানসভার ভোটারদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, তা নিয়েও শলা পরামর্শ হয় সেদিন। এবং, গেরুয়া ধ্বজায় হিন্দুত্বের হাওয়া তোলার রণকৌশলও ঠিক করা হয়।
সেদিনের হাইপ্রোফাইল বৈঠকে রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য থেকে শুরু করে ভূপেন্দ্র যাদবের মতো কেন্দ্রীয় নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। গোটা রাজ্যকে বেশ কয়েকটি অঞ্চল বা জোনে ভাগ করে ১০ টি রথযাত্রা বেরোবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রত্যাশিত ভাবেই এই রথযাত্রার অনুমতি পেতে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় বিজেপি। এদিন বিচারপতি শুভ্রা ঘোষ রথ যাত্রার অনুমতি দেন ও সেইসঙ্গে কিছু শর্ত আরোপ করেন।
•এককালীন ১০০০ এর বেশি লোক থাকবে না
•১-৬ অনুষ্ঠান করতে হবে। সাউন্ড এর ক্ষেত্রে আইন মানতে হবে
•কোনও কুরুচিকর মন্তব্য ,উত্তেজনামূলক বক্তব্য নয়
•ট্র্যাফিক জ্যাম করা যাবে না। নির্বিঘ্নে যেন যানবাহন চলাচল করতে পারে
•২০ জন ভলান্টিয়ারের ফোন নাম্বার পুলিসকে দিয়ে রাখতে হবে
•কোনও ব্যক্তিগত সম্পত্তি, সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি করা যাবে না। করলে তার দায় বর্তাবে উদ্যোক্তাদের উপর। সভাস্থল ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পরিষ্কার করে দিতে হবে । অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে ওই এলাকা থেকে সদস্যদের বার করে নিয়ে যেতে হবে।
আবেদনকারীর আইনজীবী আদালতের কাছে বলেন, আমাদের কর্মসূচি শুরু হচ্ছে ১ মার্চ কোচবিহার থেকে। ৩ মার্চ শেষ হবে। একাধিক মন্ত্রী, বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা ও প্রচুর কর্মকর্তা এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই যাত্রা বন্ধ করার চেষ্টা করছে পুলিশ । গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা স্বার্থে এই যাত্রা ।
বিচারপতি প্রশ্ন করেন, "প্রাইভেট গ্রাউন্ডে যেখানে-যেখানে এই সভা হবে, সেখানকার অনুমতি রয়েছি কি" ?
আবেদনকারীর আইনজীবী উত্তর দেন, "আছে । আবেদনপত্রের সঙ্গে উপযুক্ত কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। রাজ্য পুলিসের ডিজিকে জানানো হয়েছে, প্রায় ৯ টি জেলা দিয়ে এই যাত্রা যাবে। কোথায় কোথায় বৈঠক হবে তা-ও জানানো হয়েছে। পুলিস প্রশাসন আমাদের বলেছে, ওই সময়ে এসএসসি-র পরীক্ষা রয়েছে। আমরা জানিয়েছি, আমাদের রথযাত্রায় পরীক্ষার্থীদের কোনও অসুবিধা হবে না। ১ মার্চ কোচবিহারের কোর্ট গ্রাউন্ড থেকে সভা শুরু হবে। সন্ধ্যার পর শুরু হবে সংকল্পযাত্রা" ।
রাজ্যের আইনজীবী কিশোর দত্ত বলেন, "এই যাত্রার কোনও গুরুত্ব নেই। রাজ্যের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ করার প্রচেষ্টায় এই যাত্রা। এবং রাজনৈতিক উদ্যেশ্যপ্রণোদিত। পরীক্ষা আছে, রাস্তায় যানজট হলে সমস্যায় পড়তে পারেন পরীক্ষার্থীরা। তাছাড়া, এতবড় কর্মসূচিতে নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে পুলিসকেও সময় দেওয়া হয়নি"।
সব পক্ষের বক্তব্য শুনে বিচারপতি শুভ্রা ঘোষ শর্তসাপেক্ষে রথযাত্রা তথা সংকল্পযাত্রার অনুমতি দেন।
পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এক অভাবনীয় ধর্মীয় মেরুকরণের আবহে বাংলার বিধানসভা নির্বাচন হতে চলেছে এবার। হিন্দু-মুসলমান রাজনীতি যে আগে ছিল না তা নয়, কিন্তু শাসক ও বিরোধী দু-পক্ষই যেভাবে 'ধর্মে'র উপর সব কিছু ছেড়েছুড়ে দিয়ে ভোটের ময়দানে নামছে এবার, বাংলায় এ দৃশ্য বিরল বললেও কম বলা হয়। বিরোধী দল বিজেপির কড়াপাকের হিন্দুত্বের মোকাবিলায় শাসক তৃণমূলও নরমপাকের হিন্দুত্বকে শো-কেসে সাজাচ্ছে। তাই, একদিকে যখন বাংলার প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রে রথযাত্রা শুরু করতে চলেছে গেরুয়া শিবির, অন্যদিকে তখন জগন্নাথ মন্দির থেকে শুরু করে মহাকাল মন্দিরের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে ঘাসফুল শিবিরকে, 'উন্নয়নের পাঁচালি' সত্ত্বেও।