গতবার অতিমারী-আবহে ৮ দফায় বাংলায় বিধানসভার ভোট হয়েছিল কার্যত বিরোধীদের দাবি মেনেই। আজও রাজ্যের শাসকদল যা নিয়ে কমিশনকে খোঁচা দিতে ছাড়ে না। এমতাবস্থায়, ছাব্বিশের বিধানসভায় যে এক বা দু-দফায় ভোট হতে চলেছে, পর্যবেক্ষকরা তার ইঙ্গিত পেয়েছিলেন আগে থেকেই।
কেন?
গতবার বাংলায় ২০০ আসন টার্গেট করে ৭৭-এ মুথ থুবড়ে পড়তে হয়েছিল বিজেপিকে। আইএসএফ-এর ১ টি আসন বাদ দিলে বাম-কংগ্রেস জোট একটি শূন্য হয়ে গিয়েছিল। এমতাবস্থায়, ছাব্বিশের বিধানসভার বহু আগে থেকেই বিরোধীরা উপলব্ধি করতে শুরু করেছিল, দফা যত বেশি শাসকের লাভ তত বেশি। এবং উল্টোদিক থেকে, দফা যত কম, শাসকের সুবিধাও তত কম।
এহেন উপলব্ধির পিছনে একটি সমীকরণ কাজ করছে। অভিজ্ঞতা থেকে বিরোধী দলগুলি বুঝেছে, ৬-৭-৮ দফায় ভোট হলে শাসকদল তার কর্মীদের দ্রুত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত করার সুযোগ পায়। ধরা যাক, বারাসতে ভোট হওয়ার দিনকয়েক বাদে যদি বারুইপুরে ভোট হয়, তাহলে একই জায়গার শাসকদলের কর্মীরা দু-জায়গাতেই সমানভাবে উপস্থিত থেকে ভোট প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারেন। অন্যদিকে, বারাসত ও বারুইপুরে ১ দিনে ভোট হলে, শাসকদলের কর্মীরা কিন্তু বারাসত থেকে বারুইপুরে পৌঁছে 'ভোট করাতে' পারবেন না। গোটা রাজ্যের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। মাত্র দু-দফায় যদি বাংলাজুড়ে ভোট হয়, তাহলে কিন্তু অত সহজে দলীয় কর্মীদের কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপে নিয়ে যেতে পারবে না শাসকদল। এমতাবস্থায়, কোথাও শাসকদল গোল বাধাতে পারে, ভয় দেখাতে পারে, বিরোধী এজেন্টকে তুলে দিতে পারে ঠিকই। তবে, সেখানে শাসকের সঙ্গে বিরোধীদের টক্কর হবে প্রায় সমানে-সমানে, সংখ্যার হিসেবে। উপরন্তু, যেখানে বিরোধীদের ভোটভিত্তি রয়েছে ভালো, সেখানে লাইনে দাঁড়ানো ভোটাররা ছাপ্পার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শুরু করতে পারে।
শুধু তা-ই নয়। কেন্দ্রীয় বাহিনীকে যাতে 'ম্যানেজ' করতে না-পারে শাসকদল, তা নিয়ে কমিশনের উপর চাপ সৃষ্টি করলে অনেক বেশি কাজের কাজ হয় বলেও উপলব্ধি করেছে বিরোধীরা। এবং এবার তা করাও গিয়েছে। ভোট ঘোষণার আগে থেকেই কলকাতা-সহ গোটা বাংলায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর রুটমার্চ দেখা গিয়েছে। এবং কমিশন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, বাহিনীকে বসিয়ে রাখা চলবে না (প্রকারান্তরে 'ম্যানেজ' করার সুযোগ দেওয়া হবে না)। শনিবার গিরিশ পার্ককাণ্ডে কেন বাহিনীকে কাজে লাগানো হল না, তা নিয়ে কলকাতা পুলিসের কাছে রিপোর্ট তলব করেছে কমিশন। অর্থাৎ, ভোটের আগে থেকেই বার্তা, বাহিনীকে কাজে লাগাতে হবে।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, কমিশন এবার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, বুথের ভিতর এবং বাইরে সমানভাবে কেন্দ্রীয় বাহিনীর নজরদারি চলবে। এবং, ভোটের আগে থেকেই শুরু হবে ভয়মুক্ত ভোটের প্রস্তুতি। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, জ্ঞানেশ কুমারের দাওয়াই ইতিমধ্যেই কাজ করতে শুরু করে দিয়েছে। ভোট ঘোষণার অনেক আগে রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী এসেছে। ওই বাহিনীকে যাতে যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়, সেদিকে কড়া নজর রেখেছে কমিশন। দুদিনের বঙ্গসফরে এসে, দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার খুব তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে বলেছেন, "রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের তপোভূমিতে দাঁড়িয়ে নির্বাচন কমিশন আবারও পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি ভোটারকে বার্তা দিতে চায়, নির্বাচন হবে অহিংস (Violence Free) এবং ভয়শূন্য (Intimidation Free)"। পর্যবেক্ষকরা গুরুত্ব দিচ্ছেন দ্বিতীয়টির উপর। যে-চোখরাঙানি চোখে দেখা যায় না, যে-হুমকি কানে শোনা যায় না, একেবারে ঠিক সেই জায়গাতেই জোর দিয়েছেন তিনি: 'ইন্টিমিডেশন ফ্রি (Intimidation Free)'। বুথের ভিতর যতটা নজর কমিশনের, ঠিক ততটাই নজর বুথের বাইরে। রাজ্যের আমলা ও পুলিস কর্তাদের স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছেন জ্ঞানেশ কুমার, শুধু ভোটের দিন কোথাও কোনও রক্তপাত হবে না, তা নয়, 'নিঃশব্দ অদৃশ্য সন্ত্রাস'ও এবার আর বরদাস্ত করা হবে না। রাজ্যের এডিজি (আইন-শৃঙ্খলা) বিনীত গোয়েলকে ধমক দিয়ে তিনি বলেছেন, "সব জানি, বসুন"। বেশ কয়েকজন জেলাশাসককে সতর্ক করে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, সব কাজের 'ডিজিটাল ফুট প্রিন্ট' রয়েছে ও রয়ে যাবে, তাই, বেচাল দেখলে ভোট-পর্ব শেষ হওয়ার পরেও পদক্ষেপ করবে কমিশন।
প্রসঙ্গত, গত লোকসভা ভোটে ডায়মন্ড হারবার-সহ বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে দীর্ঘক্ষণ ওয়েবকাস্টিং বন্ধ ছিল। এবার যাতে তার পুনরাবৃত্তি না-হয়, তা সুনিশ্চিত করতে এদিনও জ্ঞানেশ কুমারের মুখে শোনা গিয়েছে, একশো শতাংশ ওয়েবকাস্টিং হবে এবং তা হচ্ছে কি না তার উপরও নজরদারি চলবে। কোথাও যদি দেখা যায় ভোট দিতে আসছে 'দুষ্টুলোকেরা', তাহলে সেখানে পুনর্নির্বাচন অবধারিত। এমতাবস্থায়, কমিশনের মুখোমুখি হয়ে বিরোধীরা ১-২ দফায় ভোটের আর্জিই জানিয়েছিল সপ্তাহখানেক আগে, কমিশনের ফুল বেঞ্চ যখন দুদিনের বঙ্গসফরে আসে। এবং শাসকদল হিসেবে তৃণমূল কিন্তু রহস্যজনকভাবে ১-২ দফায় ভোটের জন্য আর্জি করেনি বিস্ময়কর ভাবে!