তিনি রাজ্যের শ্রম দফতরের অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক। এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ নামক লুপ্তপ্রায় প্রজাতির দফতরের মাথায় ছিলেন দীর্ঘদিন। এবং তাঁর আরও একটি পরিচয় রয়েছে। তিনি সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পঞ্চম প্রজন্মের প্রতিনিধি। নাম, সুমিত্র চট্টোপাধ্যায়।
বিজেপিতে যোগ দিয়ে তাঁর নাতিদীর্ঘ বক্তব্যের বিষয়: বাংলার বেকার। অবসরপ্রাপ্ত আমলার দাবি, "১৯৭৮ সালেই বেকারভাতা চালু হয়েছিল। তারপর, বর্তমান সরকার এসে চালু করে যুবশ্রী প্রকল্প। ওই প্রকল্পের একটা ভালো দিক ছিল। মাসে যে-ভাতা দেওয়া হত, তার উপর নজর রাখা হত। ওই টাকা দিয়ে নিজেদের দক্ষতা (স্কিল ডেভেলপমেন্ট) কতটা বাড়াতে পারছেন যুবক-যুবতীরা, সেদিকে লক্ষ রাখা হতো। কিন্তু যুবসাথী প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন আছে আমার। হিসেব করলে দিনে ৫০ টাকা করে পাবেন বেকাররা। কী লাভ হবে? বাংলায় বেকারের সংখ্যা কত? সেই পরিসংখ্যান জানা আছে কি? যখন কর্মজীবনে প্রবেশ করেছিলাম, ভেবেছিলাম, কিছু একটা করব। কিন্তু তা করতে পারিনি। এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে একসময়ে অসংখ্য যুবক-যুবতী নিজেদের মার্কশিট, সার্টিফিকেটের ফটোকপি দিয়ে নাম নথিবদ্ধ করতেন। এই সরকার আসার পর, সেগুলো কিলোদরে বিক্রি করা হয়েছে। বিক্রির পর সেই টাকা এসেছে ট্রেজারিতে। খুব সংক্ষেপে বলতে গেলে, বেকারদের জন্য কিছু করার উদ্দেশ্যেই আমার বিজেপিতে যোগ দেওয়া"।
বিজেপি ও বঙ্কিমচন্দ্র
বাঙালির সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা বন্দেমাতরম ১৫০ বছরে পা-রেখেছে গতবছর। এবং তার পর থেকেই জনগণমন-র বদলে বঙ্কিমের বন্দেমাতরমকেই জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃতি দিতে আদাজল খেয়ে লেগে পড়েছে বিজেপি। সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে নরেন্দ্র মোদীর মুখে শোনা গিয়েছে 'বঙ্কিমদা'। যা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে বিস্তর। তারপর, নতুন বছরের শুরুতে, বাজেট অধিবেশনে চলাকালীন কেন্দ্রের বিজেপি সরকার নির্দেশিকা দিয়ে জানিয়েছে, জাতীয় সংগীত জনগণমন-র আগে জাতীয় গান বন্দেমাতরম গাইতে হবে। এবং একেবারে ১৯০ সেকেন্ড সময় নিয়ে ছয়টি স্তবক গাইতে হবে।
বন্দে-বিতর্ক
বিজেপি-বিরোধী দলগুলির যুক্তি ছিল, প্রথম দু-স্তবক অবধি ঠিক আছে, কিন্তু তার পরের চার-স্তবক কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ দেশের সঙ্গে সাজুয্যপূর্ণ নয়। বিশেষ করে, মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষকে তা গাইতে বাধ্য করা যায় না।
দুই-স্তবকের বাইরে কী রয়েছে?
বিজেপির 'বন্দে'রাজনীতি নেপথ্যে এক ও একাধিক কারণ দেখছেন পর্যবেক্ষকরা। এবং সেইসঙ্গে, এই রাজনীতির ফাঁদে একবার পা-ফেললে তার পরিণতি যে খুব ভালো হবে না, তা নিয়েও বিজেপিকে সতর্ক করছেন তাঁরা।
প্রথমত, জিন্না-র দাবি মেনে বন্দেমাতরম-এর দুটি স্তবকের বাইরে বেরোতে চাননি নেহেরু, বিজেপির এই দাবি অর্ধসত্য, যা মিথ্যের চেয়েও ভয়ঙ্কর। এবং, ইতিহাসের খনিজ ভান্ডার থেকে যা উঠে আসছে, তা কিন্তু আদৌ সে কথা বলছে না। বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দেমাতরম নিয়ে জওহরলাল নেহেরু যাঁর মতামত চেয়েছিলেন, তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
নেহেরু-রবীন্দ্রনাথ-নেতাজি
নেহেরুকে কী জানিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ? রবীন্দ্রনাথ স্পষ্ট জানিয়েছিলেন: বন্দেমাতরম-এর প্রথম দুই স্তবকে মাতৃভূমির অপরূপ বর্ণনা রয়েছে। যা অতুলনীয়। কিন্তু, ওই দুই স্তবকের পর যে-বন্দনা রয়েছে, তার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত ধর্ম-বোধ সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রসঙ্গত, উপনিষদপুষ্ট নিরাকার পরম ব্রহ্মে বিশ্বাস করতেন রবীন্দ্রনাথ। পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্রাহ্ম ধর্মই তাঁর ধর্ম। এমতাবস্থায়, রবীন্দ্রনাথের মূল্যায়নকে সামনে রেখে ১৯৩৭ সালে কংগ্রেস বন্দেমাতরম-এর প্রথম দুই স্তবককেই জাতীয় গান হিসেবে নেয়।
শুধু তা-ই নয়, বিতর্কিত বন্দেমাতরম নিয়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্রকেও তাঁর এই মতামত জানিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এমনকি, সংবিধান সভায় বন্দেমাতরম-এর প্রথম দুই স্তবককে গ্রহণ করার পক্ষে মত দিয়েছিলেন স্বয়ং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ও!
নেহেরু-জমানার সবকিছুকে নস্যাৎ করার যে-প্রয়াস শুরু করেছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার, 'বন্দে'রাজনীতি সেই প্রয়াসের একটি অধ্যায়মাত্র বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। সংসদে মোদীর দাবি, প্রথম দুই স্তবকের পর থেকেই বন্দেমাতরম গানটির 'প্রকৃত আত্মা' রয়েছে। এবং, তোষণের রাজনীতি করতে গিয়েই নাকি কংগ্রেস বাকি সব স্তবককে বাদ দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, এমনকি, গেরুয়া শিবিরের আদি-আদর্শ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় যেভাবে ভারত-আত্মার স্বরূপ সন্ধান করেছেন, নরেন্দ্র মোদীর দার্শনিক-বোধ কি তাঁদের চেয়েও বেশি?
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ১৯৩৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যা ছিল, দেশভাগের সাড়ে সাত দশক পর, ২০২৫-২৬ সালে, ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট তার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। এমতাবস্থায়, তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া হয় যে, জিন্নার দাবি মেনে তোষণের রাজনীতি করতে বন্দেমাতরম-এর বাকি সব স্তবক বাদ দিয়েছিলেন নেহেরু, তাহলেও প্রশ্ন রয়ে যায়। আর সেই প্রশ্ন হল, বাকি স্তবকগুলির পাঠোদ্ধার তো দূরঅস্ত, বিজেপি নেতাদের মধ্যে ক-জন তার সঠিক উচ্চারণ করতে পারবেন?
দুই স্তবকের পর কী লিখেছেন বঙ্কিমচন্দ্র?
১৮৭৫ সালে এই বন্দেমাতরম রচনা করেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। উত্তরবঙ্গের সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমিতে ১৮৮২ সালে নিজের লেখা 'আনন্দমঠ' উপন্যাসে তা অন্তর্ভুক্ত করেন তিনি।
কী রয়েছে প্রথম দুই স্তবকের বাইরে?
"সপ্তকোটীকন্ঠ-কল-কল-নিনাদকরালে
দ্বিসপ্তকোটীভুজৈধৃতখরকরবালে
অবলা কেন মা এত বলে !
বহুবলধারিণীং
নমামি তরিণীং
রিপুদলবারিণীং
মাতরম্ ৷
তুমি বিদ্যা তুমি ধর্ম্ম
তুমি হৃদি তুমি মর্ম্ম
ত্বং হি প্রাণাঃ শরীরে ৷
বাহুতে তুমি মা শক্তি
হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি
তোমারই প্রতিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে ৷
ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী
কমলা কমল-দলবিহারিণী
বাণী বিদ্যাদায়িণী
নমামি ত্বাং
নমামি কমলাম্
অমলাং অতুলাম্
সুজলাং সুফলাং
মাতরম্
বন্দে মাতরম্
শ্যামলাং সরলাং
সুস্মিতাং ভূষিতাম্
ধরণীং ভরণীম্
মাতরম্ ৷"