মুন্নি চৌধুরী: একটি রাজ্যের পরিচয় শুধু তার ইতিহাস বা সংস্কৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; সেই ঐতিহ্যকে কতটা সুরক্ষিত রেখে আগামী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া যায়, তার উপরও নির্ভর করে একটি সমাজের অগ্রগতি। পশ্চিমবঙ্গ আজ সেই পরীক্ষায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই (Geographical Indication) স্বীকৃতির ক্ষেত্রে দেশের তৃতীয় স্থানে উঠে আসা এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও খাদ্য উপাদান সংক্রান্ত জিআই নিবন্ধনের ক্ষেত্রে দেশের শীর্ষস্থান দখল করা নিঃসন্দেহে বাংলার জন্য এক গর্বের অধ্যায়।
এই সাফল্য কোনও একদিনের ঘটনা নয়। এর পিছনে রয়েছে দীর্ঘ পরিকল্পনা, গবেষণা, আইনি প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের ধারাবাহিক প্রয়াস। বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় রাজ্যের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং জৈবপ্রযুক্তি দপ্তরের ভূমিকার কথা। এই দপ্তরের নেতৃত্বে অধ্যাপক ড. কল্যাণ চক্রবর্তীর উদ্যোগে পেটেন্ট ইনফরমেশন সেন্টার ও পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কাউন্সিল যেভাবে গ্রামীণ শিল্প, কৃষিজ পণ্য এবং ঐতিহ্যবাহী খাদ্যকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথে এগিয়ে নিয়ে গেছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।
দার্জিলিং চায়ের মাধ্যমে ভারতের জিআই ইতিহাসের সূচনা হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ থেকেই। আজ সেই ঐতিহ্য আরও বিস্তৃত হয়েছে। কনকচুর ধানের খই, চন্দননগরের জলভরা সন্দেশ, জনাইয়ের মনোহরা, বেলিয়াতোড়ের মেছা সন্দেশ, নলেন গুড়-সহ একাধিক ঐতিহ্যবাহী পণ্য সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছে। মাত্র এক মাসে ২৩টি নতুন জিআই স্বীকৃতি অর্জন এবং রাজ্যের মোট জিআই পণ্যের সংখ্যা ৫৯-এ পৌঁছনো প্রমাণ করে যে এই কাজ কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব হিসেবে নয়, একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবেও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
তবে এই সাফল্যের সবচেয়ে বড় দিক হলো এর অর্থনৈতিক প্রভাব। জিআই ট্যাগ শুধু একটি সম্মানসূচক স্বীকৃতি নয়; এটি কারিগর, কৃষক এবং ক্ষুদ্র উৎপাদকদের জন্য একটি শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা। এর ফলে নকল পণ্যের বিরুদ্ধে লড়াই সহজ হয়, প্রকৃত উৎপাদক তাঁর প্রাপ্য মূল্য পান এবং আন্তর্জাতিক বাজারে একটি নির্ভরযোগ্য পরিচিতি তৈরি হয়। গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অপরিসীম।
এই যাত্রাপথে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন দপ্তর, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বাণিজ্য, কৃষি ও বিজ্ঞান মন্ত্রকের সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কেন্দ্র ও রাজ্যের সমন্বিত উদ্যোগ দেখিয়ে দিয়েছে, ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রশ্নে প্রশাসনিক সহযোগিতা কতটা কার্যকর হতে পারে।
অধ্যাপক ড. কল্যাণ চক্রবর্তীর নেতৃত্বে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দপ্তর যে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করছে, তার মূল লক্ষ্য শুধু নতুন জিআই স্বীকৃতি অর্জন নয়; বরং বাংলার মেধা, সংস্কৃতি ও উৎপাদনশীলতার একটি স্থায়ী আন্তর্জাতিক পরিচয় গড়ে তোলা। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের সুরক্ষাকে গ্রামীণ উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করার এই ভাবনা আগামী দিনের জন্যও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বাংলার ঐতিহ্যকে কাগজে-কলমে স্বীকৃতি দেওয়ার চেয়ে বড় কাজ হলো সেই ঐতিহ্যকে মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা। পশ্চিমবঙ্গ আজ সেই পথেই এগোচ্ছে। জিআই-তে এই সাফল্য শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি বাংলার আত্মপরিচয়, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ অর্থনীতির নতুন ভিত্তি।