মণি ভট্টাচার্য: রাজ্যে সংগঠিত অপরাধ, তোলাবাজি, বেআইনি দখল, মাফিয়ারাজ এবং সমাজবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে এবার আরও কঠোর অবস্থান নিতে চলেছে শুভেন্দু অধিকারী সরকার। সোমবার বিধানসভায় পেশ হতে চলেছে ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অব অ্যান্টি-সোশ্যাল অ্যাকটিভিটিজ বিল, ২০২৬’। একইসঙ্গে কংগ্রেস আমলের পুরনো আইন সংশোধনের লক্ষ্যে আনা হচ্ছে ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল মেনটেন্যান্স অব পাবলিক অর্ডার (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’। বিজেপি নির্বাচনী প্রচারে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল—‘ভয় আউট, ভরসা ইন’—এই বিলকে তারই বাস্তব রূপ হিসেবে দেখছে রাজনৈতিক মহল। বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ইতিমধ্যেই স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছিলেন, “কোনও চোরকে ছাড়া হবে না। শুধু জেলে পাঠানো নয়, অপরাধ করে গড়ে তোলা সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করে নিলামে তোলা হবে।”
কী উদ্দেশ্যে এই নতুন আইন?
স্বরাষ্ট্র দফতরের দাবি, শুধু অপরাধ ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই তা রুখে দেওয়াই এই আইনের মূল লক্ষ্য। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সংগঠিত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনতেই এই আইন আনা হচ্ছে।
কাদের 'গুন্ডা' বলা হবে?
বিলে 'গুন্ডা'র সংজ্ঞা যথেষ্ট বিস্তৃত রাখা হয়েছে। শুধু অপরাধী নয়, অপরাধচক্রের সদস্য, অর্থ জোগানদাতা, অস্ত্র বা মাদক আইনে অভিযুক্ত ব্যক্তি, মানবপাচার বা বিস্ফোরক আইনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং সমাজের পক্ষে বিপজ্জনক বলে পরিচিত ব্যক্তিদেরও এই আইনের আওতায় আনা যাবে।
প্রতিরোধমূলক আটক, সর্বোচ্চ এক বছর
আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল Preventive Detention। কোনও ব্যক্তি ভবিষ্যতে জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারেন বলে প্রশাসনের ধারণা হলে, তাঁকে বিচার শুরুর আগেই আটক রাখা যাবে। সর্বোচ্চ ১২ মাস পর্যন্ত হেফাজতে রাখার সুযোগ থাকছে সরকারের হাতে। পুলিশ সুপার বা তার ঊর্ধ্বতন আধিকারিকের রিপোর্টের ভিত্তিতে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। বিশেষ পরিস্থিতিতে জেলা শাসক বা পুলিশ কমিশনারও আটকের নির্দেশ দিতে পারবেন।
সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের পথ আরও সহজ
মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার প্রতিফলনও দেখা যাচ্ছে বিলে। অসামাজিক কার্যকলাপের মাধ্যমে অর্জিত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে প্রশাসনকে। তদন্তে প্রমাণ মিললে সেই সম্পত্তি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিলামের পথও খুলে যাবে।
এলাকা ছাড়ার নির্দেশও দিতে পারবে প্রশাসন
শুধু গ্রেফতার নয়, কোনও ব্যক্তির উপস্থিতি যদি কোনও এলাকায় অশান্তির কারণ হতে পারে বলে প্রশাসনের মনে হয়, তাহলে তাঁকে ওই এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া যাবে। এমনকি এক বছর পর্যন্ত সেখানে প্রবেশেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা সম্ভব হবে।
পলাতকদের বিরুদ্ধেও কড়া ব্যবস্থা
আটকের নির্দেশের পর কেউ আত্মগোপন করলে আদালতের মাধ্যমে হাজিরার নির্দেশ জারি হবে। নির্দেশ অমান্য করলে তাঁর বিরুদ্ধে পরোয়ানা, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং অতিরিক্ত ফৌজদারি ব্যবস্থাও নেওয়া যাবে।
থাকবে বিচারপতির নেতৃত্বে অ্যাডভাইজরি বোর্ড
এই আইনের অপব্যবহার রুখতে গঠন করা হবে বিশেষ Advisory Board। হাইকোর্টের বর্তমান বা প্রাক্তন বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত এই বোর্ড আটক বৈধ কি না তা পর্যালোচনা করবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরকারকে মতামত জানাবে। বোর্ড যদি মনে করে আটকের যথেষ্ট কারণ নেই, তাহলে আটক ব্যক্তিকে মুক্তি দিতে হবে।
পুলিশের হাতে বাড়ছে তল্লাশি ও বাজেয়াপ্তের ক্ষমতা
নতুন আইনে পুলিশকে আরও বিস্তৃত ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন মনে করলে কোনও বাড়ি, গাড়ি বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালিয়ে অপরাধে ব্যবহৃত নথি, টাকা বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা যাবে।
জামিন পাওয়া সহজ হবে না
এই আইনের আওতায় দায়ের হওয়া অধিকাংশ অপরাধকে Cognizable এবং Non-Bailable রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, পুলিশ পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতার করতে পারবে এবং সহজে জামিনও মিলবে না।
বিতর্কের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছে না রাজনৈতিক মহল
সরকারের দাবি, সংগঠিত অপরাধ নির্মূলে এই আইন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, 'সৎ উদ্দেশ্যে' কাজ করার ক্ষেত্রে সরকারি আধিকারিকদের আইনি সুরক্ষা এবং প্রতিরোধমূলক আটকের মতো ধারাগুলি ভবিষ্যতে বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। বিরোধীদের অভিযোগ, কঠোর এই আইন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে সরকারের বক্তব্য একটাই—আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ। এখন নজর সোমবার বিধানসভায়। বিলটি পাস হলে পশ্চিমবঙ্গে সংগঠিত অপরাধ দমনে এক নতুন আইনি অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে।