মুন্নি চৌধুরী: প্রশাসনের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু আইন বা ক্ষমতা নয়, মানুষের কাছে পৌঁছনোর সক্ষমতা। নাগরিকের সমস্যা যত দ্রুত সরকারের টেবিলে পৌঁছবে এবং তার সমাধান যত দ্রুত হবে, ততই প্রশাসনের প্রতি মানুষের আ...
মুন্নি চৌধুরী: প্রশাসনের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু আইন বা ক্ষমতা নয়, মানুষের কাছে পৌঁছনোর সক্ষমতা। নাগরিকের সমস্যা যত দ্রুত সরকারের টেবিলে পৌঁছবে এবং তার সমাধান যত দ্রুত হবে, ততই প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে। পশ্চিমবঙ্গের পুর ও নগরোন্নয়ন দপ্তরের নতুন উদ্যোগ ‘মুখোমুখি’ সেই আস্থার সেতু নির্মাণেরই এক গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস।
বছরের পর বছর ধরে নাগরিকদের অভিযোগ, জল নেই, রাস্তা ভাঙা, নিকাশি ব্যবস্থা অচল, জন্ম-মৃত্যুর শংসাপত্র পেতে হয়রানি, বিল্ডিং সংক্রান্ত জটিলতা কিংবা কর্পোরেশনের উদাসীনতা। অভিযোগ জানাতে জানাতে অনেকেই ক্লান্ত হয়ে পড়েন, কিন্তু সমাধান মেলে না। এই বাস্তবতা বদলানোর লক্ষ্য নিয়েই পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা নিছক একটি প্রশাসনিক কর্মসূচি নয়; এটি সরকার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের একটি নতুন মডেল।
৪ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ‘মুখোমুখি’ কর্মসূচিতে প্রতি সপ্তাহে নির্দিষ্ট সময়ে সাধারণ মানুষ সরাসরি পুরমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে পারবেন। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, মন্ত্রীর সঙ্গে একই টেবিলে উপস্থিত থাকবেন সংশ্লিষ্ট কর্পোরেশনের আধিকারিকরা। অর্থাৎ অভিযোগ শুধু শোনা হবে না, তাৎক্ষণিকভাবে দায়বদ্ধ প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যেই সমাধানের প্রক্রিয়া শুরু হবে। এই উদ্যোগের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হল জবাবদিহি। অভিযোগ গ্রহণের পর আবেদনকারীকে এসএমএস পাঠিয়ে জানানো হবে যে অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। সমস্যা সম্পূর্ণ মিটে না যাওয়া পর্যন্ত সেই অভিযোগ খোলা থাকবে। সরকারি পরিষেবার ক্ষেত্রে এমন ট্র্যাকিং ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের আস্থা অনেকটাই বাড়াতে পারে।
অগ্নিমিত্রা পাল দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বারবার বলেছেন, পুর পরিষেবা শুধু দপ্তরের চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রশাসনকে মানুষের দরজায় পৌঁছতে হবে। 'মুখোমুখি' সেই দর্শনেরই বাস্তব রূপ। একজন মন্ত্রী নিজে নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ করে নাগরিকদের অভিযোগ শুনবেন— গণতান্ত্রিক প্রশাসনে এমন উদ্যোগ বিরল বললেও অত্যুক্তি হবে না।
অবশ্যই এই কর্মসূচির সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। প্রতিদিন অসংখ্য অভিযোগ জমা পড়বে। সব অভিযোগ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করা সহজ হবে না। কিন্তু প্রশাসনিক সংস্কারের প্রতিটি বড় উদ্যোগই একদিন ছোট পদক্ষেপ হিসেবেই শুরু হয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ হল রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং বাস্তবায়নের আন্তরিকতা। সেই সদিচ্ছার বার্তাই দিয়েছে এই উদ্যোগ।
বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে নির্মাণ নিরাপত্তা, পুরসভার কাজের স্বচ্ছতা এবং নাগরিক পরিষেবা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার প্রেক্ষাপটে 'মুখোমুখি' কর্মসূচি প্রশাসনের দায়বদ্ধতার নতুন প্রতিশ্রুতি হিসেবেও দেখা যেতে পারে। আজকের দিনে মানুষ শুধু প্রতিশ্রুতি চান না, ফলাফল চান। অগ্নিমিত্রা পালের এই উদ্যোগ সেই প্রত্যাশা পূরণের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়, যদি আধিকারিকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়, তবে এই কর্মসূচি শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, দেশের অন্যান্য রাজ্যের কাছেও একটি অনুসরণযোগ্য প্রশাসনিক মডেল হয়ে উঠতে পারে।
সরকার ও নাগরিকের দূরত্ব কমানোর এই প্রয়াস সফল হোক— সেটাই এখন সময়ের দাবি। কারণ, গণতন্ত্রে সবচেয়ে কার্যকর প্রশাসন সেই, যে প্রশাসন মানুষের কথা শোনে, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয় এবং প্রতিশ্রুতির মতোই কাজে বিশ্বাস করে।