মণি ভট্টাচার্য: ক্ষমতায় আসার আগে শুভেন্দু অধিকারী বারবার একটি কথাই বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে ফিরবে আইনের শাসন, চলবে না শাসকের আইন। প্রশাসন কোনও ব্যক্তি, দল বা পদমর্যাদার দিকে তাকিয়ে কাজ করবে না; আইন সবার জন্য সমান হবে। সাম্প্রতিক অনন্ত মহারাজ বিতর্কে সেই প্রতিশ্রুতিরই বাস্তব প্রতিফলন দেখা গেল বলে মনে করছেন অনেকেই।
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ অনন্ত মহারাজের বিতর্কিত মন্তব্য সামনে আসার পর রাজ্যজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন পর্যন্ত এই মন্তব্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। কারণ নেতাজি শুধুমাত্র একজন রাজনৈতিক নেতা নন, তিনি বাঙালির আত্মমর্যাদা, জাতীয়তাবাদ এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অমর প্রতীক। এই ঘটনার পর মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন, সরকার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেছিলেন, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। কিন্তু বিরোধী শিবিরের একাংশ তখন প্রশ্ন তুলতে শুরু করে, এ কি শুধুই রাজনৈতিক বক্তব্য, নাকি সত্যিই কোনও পদক্ষেপ করা হবে?
সেই প্রশ্নের উত্তর মিলল খুব স্পষ্টভাবেই। দীর্ঘ বিতর্কের পর শুক্রবার সকালে অনন্ত মহারাজ প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। কিন্তু শুধুমাত্র ক্ষমা চাইলেই দায় শেষ হয়ে যায় না, এই বার্তাই কার্যত দিল সরকার। মুখ্যমন্ত্রীও স্পষ্ট করে জানান, ক্ষমা চাওয়া ভালো, কিন্তু যে মন্তব্য করা হয়েছে তা অত্যন্ত গুরুতর এবং ক্ষমার অযোগ্য।
এরপরই কোচবিহার জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে অনন্ত মহারাজের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। একজন বর্তমান রাজ্যসভার সাংসদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বার্তা বহন করে। এই পদক্ষেপ দেখিয়ে দিল, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় বা সাংসদ পদ কোনও সুরক্ষা-কবচ হতে পারে না।
শুধু তাই নয়, গোটা ঘটনায় প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা বিশেষভাবে নজর কাড়ে। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে একাধিক উসকানিমূলক ও বিতর্কিত ফেসবুক পোস্ট সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, বহু সামাজিক মাধ্যমের অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, মোট ছয়টি মামলা দায়ের হয়েছে এবং পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রশাসন কেবল একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে প্রতিক্রিয়া দেখায়নি, বরং গোটা পরিস্থিতিকে আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করে পদক্ষেপ করেছে।
অনেকের মতে, এখানেই শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। এই সরকার বুঝিয়ে দিয়েছে যে নেতাজির মতো জাতীয় বীরকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করলে তার রাজনৈতিক পরিচয় বিচার করা হবে না; বিচার হবে আইনের চোখে। যে ব্যক্তি শাসক দলের, বিরোধী দলের বা প্রভাবশালী কোনও পদে থাকুন না কেন, আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলবে।,রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকতে পারে, ইতিহাস নিয়ে বিতর্কও হতে পারে। কিন্তু জাতীয় আইকনদের সম্মান এবং সামাজিক সম্প্রীতির প্রশ্নে কোনও আপস করা যায় না। অনন্ত মহারাজ ইস্যুতে সরকারের পদক্ষেপ সেই নীতিরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
সব মিলিয়ে এই ঘটনাকে অনেকেই পশ্চিমবঙ্গে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছেন। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকার দেখিয়ে দিয়েছে, প্রশাসনের কাজ রাজনৈতিক সুবিধা দেখা নয়, আইনের মর্যাদা রক্ষা করা। নেতাজির সম্মানের প্রশ্নে কোনও রকম ছাড় না দিয়ে সরকার যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, তা রাজ্যের মানুষের কাছেও একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দিয়েছে—পদ বড় নয়, আইনই সবচেয়ে বড়। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বাঙালির গর্ব, ভারতের গর্ব। তাঁর মর্যাদার প্রশ্নে আপস নয়, অনন্ত মহারাজ বিতর্কে সরকারের পদক্ষেপ সেই বার্তাকেই আরও একবার প্রতিষ্ঠিত করল।