মণি ভট্টাচার্য: একই রাস্তা। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধান। অথচ ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা। একদিন সেই রাস্তায় উঠেছিল ক্ষোভের ঝড়। পুলিশের হেফাজতে মৃত এক তৃণমূল কর্মীর বাড়িতে গিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে ঘিরে স্থানীয়দের একাংশের বিক্ষোভ, কটূক্তি, ‘চোর-ডাকাত’ স্লোগান, এমনকি গাড়িতে কাদা ছোড়ার অভিযোগ, সব মিলিয়ে মুহূর্তের মধ্যে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল হালিশহরের রাস্তা। স্থানীয়দের একাংশের প্রশ্ন ছিল, দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার সময় তাঁকে পাশে পাওয়া যায়নি কেন? আজ যখন একজন রাজনৈতিক কর্মীর মৃত্যু হয়েছে, তখনই বা কেন এই বাড়িতে আসা?
তার ঠিক পরের দিন সেই একই রাস্তায় দেখা গেল সম্পূর্ণ অন্য একটি ছবি। মৃত তৃণমূল কর্মীর বাড়িতে গেলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রাজনৈতিক পরিচয় দেখলেন না, দলীয় রং দেখলেন না। দেখলেন একজন মৃত মানুষের পরিবারকে। শোকাহত স্ত্রীকে পাশে বসিয়ে কথা বললেন। পরিবারের হাতে তুলে দিলেন ১০ লক্ষ টাকার আর্থিক সহায়তা। স্ত্রীকে চাকরির আশ্বাস দিলেন। দুই শিশুর পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়ার কথাও জানালেন। শুধু সহানুভূতি প্রকাশ করেই থেমে থাকেননি, মৃত্যুর ঘটনায় যারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন।
এই জায়গাটাতেই ঘটনাটি শুধু একটি রাজনৈতিক সফর থাকে না। হয়ে ওঠে বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে একটি বড় প্রশ্ন। একজন মানুষ কোন দলের কর্মী, সেটা কি তাঁর মৃত্যুর পরেও সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে থাকবে? নাকি মৃত্যুর পর দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তাঁর পরিবারকে একজন নাগরিকের পরিবার হিসেবে দেখা হবে?
শুভেন্দু অধিকারী নিজেই জানিয়েছেন, রাজনৈতিক মতাদর্শ আলাদা হলেও মৃতের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো সরকারের দায়িত্ব। এই বক্তব্যের রাজনৈতিক মূল্যায়ন যে যার মতো করবেন। কিন্তু মানবিকতার জায়গা থেকে প্রশ্নটা আরও সহজ, একটি পরিবার যখন একজন স্বামী, একজন বাবা, একজন অভিভাবককে হারায়, তখন তার পাশে দাঁড়ানোর আগে কি দলীয় পতাকা দেখতে হয়? রাজনীতির সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি সম্ভবত এখানেই, জীবিত অবস্থায় আমরা মানুষকে প্রথমে ‘দল’ হিসেবে দেখি, ‘মানুষ’ হিসেবে নয়। মৃত্যুর পরেও সেই বিভাজনকে টেনে নিয়ে যাই। অথচ শোকের কোনও দল হয় না। সন্তানের চোখের জল তৃণমূল-বিজেপি বোঝে না। বিধবার কান্নার কোনও রাজনৈতিক রং নেই। আর এখানেই হালিশহরে দাঁড়িয়ে রাজধর্মের পাঠ দিলেন শুভেন্দু অধিকারী, প্রাক্তন তৃণমূল মুখ্যমন্ত্রীকে।
হয়তো সেই কারণেই এক রাতের ব্যবধানে একই রাস্তার দুই ছবি এতটা তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিন কাদার অভিযোগ, পরের দিন ফুলের অভ্যর্থনা। একদিন ক্ষোভ, অন্যদিন কৃতজ্ঞতা। তবে এই ফুল শুধু একজন মুখ্যমন্ত্রীর জন্য নয়। এই ফুল হয়তো মানুষ তার কাছে দেখতে চাওয়া একটি প্রশাসনিক আচরণের জন্য ছুড়েছে, ক্ষমতার মানুষ যেন শুধু নিজের দলের মানুষের না হন। মুখ্যমন্ত্রী যেন শুধু ভোটের সময় নয়, বিপদের সময়ও মানুষের দরজায় পৌঁছন।
তদন্তের ফল কী হবে, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী, দোষীরা শাস্তি পাবে কি না, সেসবের উত্তর সময়ই দেবে। ১০ লক্ষ টাকার সাহায্য, চাকরির আশ্বাস বা পড়াশোনার দায়িত্বও একজন মৃত মানুষকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। কিন্তু একটি শোকাহত পরিবারকে এই বার্তাটা দেওয়া যায়—‘তোমরা একা নও, সরকার তোমাদের পাশে আছে।’ রাজনীতির ভাষায় হয়তো এটি একটি সফর। প্রশাসনের ভাষায় একটি ঘোষণা। কিন্তু একটি পরিবারের কাছে এটি হয়তো তাদের সবচেয়ে কঠিন সময়ে পাওয়া সামান্য আশ্রয়।
আর বাংলার রাজনীতির কাছে এটি একটি বড় শিক্ষা, ক্ষমতা বদলায়, সরকার বদলায়, রাজনৈতিক পতাকা বদলায়। কিন্তু মানুষের কান্নার সামনে একজন মুখ্যমন্ত্রীর প্রথম পরিচয় হওয়া উচিত, তিনি মুখ্যমন্ত্রী, সবার। সেই কারণেই হয়তো একই রাস্তায় ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে কাদা আর ফুল—দুই ছবি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে গেল। আর সেই দুই ছবির মাঝখানে লুকিয়ে রইল বাংলার রাজনীতির একটি বড় প্রশ্ন, মুখ্যমন্ত্রী কি শুধু নিজের সমর্থকদের? নাকি তিনি শেষ পর্যন্ত সকলের? উত্তর দিয়ে গেলেন শুভেন্দু অধিকারী।