মণি ভট্টাচার্য: দুই বছর কেটে গিয়েছে। ক্যালেন্ডারের পাতা বদলেছে, সময় এগিয়েছে। কিন্তু সন্তান হারানোর যন্ত্রণা কি কখনও সময়ের সঙ্গে কমে? অভয়ার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সেই প্রশ্নেরই যেন উত্তর হয়ে...
মণি ভট্টাচার্য: দুই বছর কেটে গিয়েছে। ক্যালেন্ডারের পাতা বদলেছে, সময় এগিয়েছে। কিন্তু সন্তান হারানোর যন্ত্রণা কি কখনও সময়ের সঙ্গে কমে? অভয়ার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সেই প্রশ্নেরই যেন উত্তর হয়ে উঠল এক মায়ের কান্না। মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বারবার ভেঙে পড়লেন অভয়ার মা রত্না দেবনাথ। কাঁদতে কাঁদতে মেয়েকে উদ্দেশ্য করে তাঁর প্রশ্ন“কেমন আছিস তুই মা?” তারপর একের পর এক স্মৃতি। ছোটবেলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে মেয়ের লেখা, কোনওদিন বড় কোনও বায়না না করা, বরং পরিবারের অভিভাবকের মতো পাশে থাকা সব বলতে বলতে যেন ফের ফিরে গেলেন সেই দিনগুলিতে। “কতদিন তোমার হাত ধরে হাঁটি না”—এই আক্ষেপে ভারী হয়ে উঠল তাঁর গলা। কিন্তু মেয়েকে তিনি শুধু ‘নির্যাতিতা’ হিসেবে মনে রাখতে চান না। তাঁর স্পষ্ট কথা, মেয়েকে তিনি সারাজীবন একজন চিকিৎসক হিসেবেই স্বীকৃতি দিয়ে যেতে চান।
মায়ের সেই কান্না যখন গোটা অনুষ্ঠানের পরিবেশকে ভারী করে তুলেছে, তখন মঞ্চের অন্যপ্রান্তেও আবেগ সামলাতে পারেননি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। অভয়ার মায়ের কথা শুনতে শুনতে তাঁর চোখ থেকেও গড়িয়ে পড়ে জল। রাজনৈতিক মঞ্চে সাধারণত কঠোর ভাষায় কথা বলা মুখ্যমন্ত্রীর চোখে এমন আবেগের ছবি অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেককেই নীরব করে দেয়।
এরপর বক্তব্য রাখতে গিয়ে শুভেন্দু অধিকারীর কণ্ঠেও উঠে আসে দৃঢ় প্রত্যয়। তিনি জানান, অভয়াকে ভোলা হয়নি। এই ঘটনার পুনর্তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি অভয়ার মায়ের অভিযোগগুলিও খতিয়ে দেখার কথা বলেন তিনি। তাঁর বার্তা, এই ঘটনার শেষ দেখে ছাড়বেন তিনি, অভয়ার মা যে প্রশ্নগুলো তুলে ধরেছেন, দেহ তড়িঘড়ি সৎকার করা হয়েছিল কি না, সেই সময় শ্মশানঘাটে ঠিক কী ঘটেছিল, সেগুলিও তদন্তের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশাসনিক ঘোষণা আর তদন্তের বাইরে এই দিনের সবচেয়ে বড় ছবি হয়ে রইল এক মায়ের চোখের জল। যে মা দুই বছর পরও মেয়ের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে বলেন, “কেমন আছিস তুই মা?” আর সেই কান্না শুনে চোখের জল ধরে রাখতে পারেন না রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী।
একজন মা তাঁর মেয়েকে ফিরে পাবেন না। কোনও তদন্তই সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারবে না। কিন্তু সেই মায়ের একটাই দাবি—মেয়ের মৃত্যুর সত্যিটা সামনে আসুক, বিচার হোক। দুই বছর পরও তাই অভয়ার স্মৃতি শুধু একটি মামলার নাম নয়। এটি এক মায়ের না-ফুরোনো অপেক্ষা, এক পরিবারের অপূরণীয় শোক এবং ন্যায়বিচারের জন্য অবিরাম লড়াইয়ের প্রতীক। সময় হয়তো এগিয়ে যায়। কিন্তু মায়ের কাছে সন্তান হারানোর সেই দিনটি থেমেই থাকে।