মণি ভট্টাচার্য: কেউ বাড়ি আছেন ? কোমর সমান জলে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলেন এক ব্যক্তি, বাড়ির দোতলা থেকে উত্তর এল, কে আপনি? পাল্টা উত্তরে ওই ব্যক্তি জবাব দিলেন আমি সেনসাস কর্মী মুন্না ঘোষ, আপনাদের পরিবারে...
মণি ভট্টাচার্য: কেউ বাড়ি আছেন ? কোমর সমান জলে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলেন এক ব্যক্তি, বাড়ির দোতলা থেকে উত্তর এল, কে আপনি? পাল্টা উত্তরে ওই ব্যক্তি জবাব দিলেন আমি সেনসাস কর্মী মুন্না ঘোষ, আপনাদের পরিবারের জনগণনা করতে এসেছি। শুনেই তড়িঘড়ি ছুটে গেলেন পরিমল(নাম পরিবর্তিত)। মুন্নাকে ডেকে নিলেন দোতলায়, বারাসত ব্লক ১ এ, কাশিমপুর পঞ্চায়েতের মরাইট শষ্ঠীতলার মাঠে বরাবর বৃষ্টি হলেই জল জমে, সেই এলাকায় মাঠের মধ্যে কয়েকটি বাড়িতে বৃষ্টির সময় থাকতে হয় দোতলাতেই। কিন্তু সেই প্রতিকূলতা দায়িত্ব পালনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি মুন্না ঘোষের কাছে। সেই কোমর সমান জল পার করে নিজের কাজ করতে পৌঁছে গেলেন পেশায় স্কুল শিক্ষক মুন্না ঘোষ। কাজের উপর এই ভালোবাসা দেখে কার্যত মুগ্ধ ওই এলাকার বিডিও সহ বাকি কর্মীরা।
রাজ্য জুড়ে শুরু হয়েছে জনগণনার কাজ, রাজ্যের প্রান্তিক জেলা গুলিতে বৃষ্টির মধ্যে বন্যা বা দুর্যোগের কথা সবারই জানা। এই অবস্থায় রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশকে পাথেয় করে বাংলাকে পরিশুদ্ধ করতে মাঠে নেমে পড়েছেন বহু সেনসাস কর্মী। প্রাথমিক ভাবে এই সেনসাস কর্মী মুন্না ঘোষের লড়াইয়ের চিত্র আমাদের ক্যামেরায় ধরা পড়তেই কথা বলি আমরা, তিনি জানান পেশায় তিনি কাশিমপুর হাইস্কুলের চুক্তিভিত্তিক কম্পিউটার শিক্ষক। এবার কাশিমপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের পতিনচা মৌজার ৮৭ ও ৮৮ নম্বর সংসদে বিল্ডিং ও জনগণনার দায়িত্ব পড়েছে তাঁর উপর। রাজ্যজুড়ে জনগণনার কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই দায়িত্ব নিয়ে মাঠে নেমেছেন মুন্না। কিন্তু বৃষ্টির কারণে তাঁর দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকার বেশ কিছু অংশে জল জমে যাওয়ায় তৈরি হয় কঠিন পরিস্থিতি। তবুও শনিবার সকালে কাজ এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায়, মুন্না জানতেন যে ওই এলাকায় বর্ষার সময় জল জমা নতুন কোনও ঘটনা নয়। তাই পরিস্থিতি প্রতিকূল হলেও বাড়ি বাড়ি পৌঁছে তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু করেন তিনি। আর সেই দায়িত্ব পালনের ছবি যখন ক্যামেরায় ধরা পড়ে, তখন তা দেখে রীতিমতো মুগ্ধ হন প্রশাসনের কর্মীরাও। কোমর সমান জল পেরিয়ে মুন্না যখন বাড়ির পর বাড়ি ঘুরে জনগণনার কাজ করছেন, তখন তাঁর কাছে বিষয়টি ছিল শুধুই কর্তব্য। মুন্না জানান, দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকায় এখনও অনেক কাজ বাকি রয়েছে। তাই সকাল থেকেই তিনি ঠিক করেছিলেন যতটা সম্ভব কাজ এগিয়ে রাখবেন। প্রবল বৃষ্টি এবং জল জমার কারণে এলাকার কয়েকটি বাড়িতে পৌঁছনো কঠিন হলেও জনগণনার কাজ বন্ধ রাখার কথা ভাবেননি তিনি। ইতিমধ্যেই তাঁর দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকায় ১৫৪টি পরিবারের জনগণনা এবং ১০৩টি বিল্ডিংয়ের সেনসাসের কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান মুন্না।
এই ঘটনার কথা প্রশাসনের কাছে পৌঁছতেই মুন্না ঘোষের প্রশংসা করেন বারাসত ১ নম্বর ব্লকের বিডিও অভিজিৎ দাস। শুধু মুন্না নন, তাঁর অধীন এলাকায় কর্মরত অন্যান্য সেনসাস কর্মীরাও অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সঙ্গে নিজেদের কাজ করছেন বলে জানান তিনি। বিডিওর কথায়, প্রতিকূল আবহাওয়া বা দুর্গম পরিস্থিতির মধ্যেও কর্মীরা দায়িত্ব পালনে পিছিয়ে আসছেন না। প্রত্যেকেই নিজেদের কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করার চেষ্টা করছেন।
এদিকে মরাইট এলাকার বাসিন্দারাও মুন্নার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তাঁদের দাবি, মুন্না এই এলাকারই গুণী ও পরিচিত ছেলে। শিক্ষকতার পাশাপাশি যে দায়িত্ব তাঁর উপর দেওয়া হয়েছে, সেটিও তিনি সমান গুরুত্বের সঙ্গে পালন করছেন। কোমর সমান জল পেরিয়ে শুধুমাত্র নিজের দায়িত্ব পালন করতে তাঁর বাড়িতে পৌঁছে যাওয়ার ঘটনাটি দেখে অনেকেই অভিভূত। একদিকে কোমর সমান জল, অন্যদিকে সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার দায়িত্ব। এই দুইয়ের মাঝেও দায়িত্ব থেকে এক পা পিছিয়ে যাননি স্কুলশিক্ষক মুন্না। আর তাই বারাসতের জলমগ্ন এক গ্রামের এই সেনসাস কর্মীর লড়াই এখন হয়ে উঠেছে কর্তব্যবোধের এক অনন্য উদাহরণ।