একসময় পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা মানেই ছিল কালীঘাটের ইচ্ছার প্রতিফলন। কোন বিল আসবে, কতক্ষণ আলোচনা হবে, কে কী বলবেন— সবকিছুর নেপথ্যে থাকত একটাই কেন্দ্র, কালীঘাট। কিন্তু সময় বদলেছে। আর সেই বদলের সবচেয়ে বড় প...
একসময় পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা মানেই ছিল কালীঘাটের ইচ্ছার প্রতিফলন। কোন বিল আসবে, কতক্ষণ আলোচনা হবে, কে কী বলবেন— সবকিছুর নেপথ্যে থাকত একটাই কেন্দ্র, কালীঘাট। কিন্তু সময় বদলেছে। আর সেই বদলের সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে উঠল বিধানসভার বিজনেস অ্যাডভাইজারি কমিটি বা বিএ কমিটি।
যে কমিটি কার্যত গোটা বিধানসভার রূপরেখা ঠিক করে, সেই কমিটিতেই জায়গা পেল না কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের একজনও। অথচ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামী একাধিক বিধায়ক রয়েছেন সেই তালিকায়। শুধু তাই নয়, বাম, কংগ্রেস, আইএসএফ কিংবা আমজনতা উন্নয়ন পার্টির প্রতিনিধিও রয়েছেন সেখানে। বাদ শুধুই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির।রাজনীতিতে প্রতীকের গুরুত্ব অনেক। আর এই বাদ পড়া নিছক প্রশাসনিক ঘটনা নয়, বরং একটি যুগের অবসানের ইঙ্গিত বলেই মনে করছেন অনেকেই। কারণ, বিরোধী দলনেতার পদ আগেই হাতছাড়া হয়েছে। মুখ্য সচেতকের পদও চলে গিয়েছে। এবার বিধানসভার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কমিটি থেকেও কার্যত মুছে গেল কালীঘাট তৃণমূলের অস্তিত্ব।
একসময় যাঁরা বলতেন, "দল আমিই", আজ তাঁদেরই দল নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যে তৃণমূল কংগ্রেসকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের হাতে গড়েছিলেন, সেই দলেরই বড় অংশ এখন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। স্পিকারও কার্যত ঋতব্রতপন্থীদেরই তৃণমূলের প্রতিনিধি হিসেবে ধরে নিয়ে কমিটি গঠন করেছেন। এ যেন ইতিহাসের নির্মম পরিহাস। যে কালীঘাট থেকে গত ১৫ বছর বিধানসভার প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রিত হয়েছে, আজ সেই কালীঘাটেরই কোনও প্রতিনিধিত্ব নেই বিধানসভার 'কিচেন ক্যাবিনেট'-এ।
প্রশ্ন উঠছে, এটা কি শুধুই সাংগঠনিক দুর্বলতা? নাকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক প্রভাবের ক্রমশ ক্ষয়? একের পর এক পুরনো সঙ্গীর দলত্যাগ, ঋতব্রত শিবিরে যোগদান, আর এখন বিধানসভার গুরুত্বপূর্ণ কমিটি থেকে বাদ পড়া— সবকিছু মিলিয়ে কালীঘাটের রাজনৈতিক একচ্ছত্র আধিপত্যে যে বড়সড় ফাটল ধরেছে, তা অস্বীকার করা কঠিন।
একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলতেন, "মানুষই আমার শক্তি"। কিন্তু আজ প্রশ্ন— সেই মানুষ, সেই নেতা, সেই সংগঠন— কতটা এখনও তাঁর সঙ্গে আছে? বিধানসভার বিএ কমিটির নতুন তালিকা হয়তো শুধুমাত্র কয়েকটি নামের তালিকা নয়। এটি হয়তো বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন শক্তির উত্থান এবং এক পুরনো রাজনৈতিক অধ্যায়ের ক্রমশ ফিকে হয়ে যাওয়ার দলিল।