মণি ভট্টাচার্য: রাজনীতিতে বিশ্বাসঘাতকতা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সবচেয়ে বড় আঘাত আসে তখনই, যখন নিজের হাতে তৈরি করা মানুষরাই একদিন অন্য পতাকার নীচে দাঁড়িয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আজ যেন সেই দৃশ্যই ক্...
মণি ভট্টাচার্য: রাজনীতিতে বিশ্বাসঘাতকতা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সবচেয়ে বড় আঘাত আসে তখনই, যখন নিজের হাতে তৈরি করা মানুষরাই একদিন অন্য পতাকার নীচে দাঁড়িয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আজ যেন সেই দৃশ্যই ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যে তৃণমূল কংগ্রেস একদিন ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একক নেতৃত্বের প্রতীক, সেই দলেই আজ প্রশ্ন— মমতার পাশে আর কে রয়েছেন?
একসময় ফিরহাদ হাকিম ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছায়াসঙ্গী। অরূপ বিশ্বাস ছিলেন তাঁর অত্যন্ত বিশ্বস্ত সৈনিক। জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক বা বালুও ছিলেন সেই আস্থার বৃত্তের অন্যতম সদস্য। রাজনৈতিক ঝড়ঝাপটা, দুর্নীতির অভিযোগ, জেলযাত্রা— সবকিছুর পরেও মমতা তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বিশেষ করে রেশন দুর্নীতি মামলায় গ্রেফতার হওয়ার পরেও জ্যোতিপ্রিয়কে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছিলেন তিনি। প্রশ্ন তুলেছিলেন, "বালু করেছেটা কী?" সেই বক্তব্যে ছিল আস্থা, ছিল আবেগও।
কিন্তু রাজনীতির বাস্তব অনেক সময় আবেগকে জায়গা দেয় না। আজ সেই জ্যোতিপ্রিয়ই দল ছেড়ে বেরিয়ে এসেছেন। বিধানসভায় গিয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘরে। পরে তাঁর সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দফতরেও গিয়েছেন বলে খবর। ঘটনাটি প্রতীকী হোক বা রাজনৈতিক, বার্তাটি স্পষ্ট— মমতার চারপাশের বৃত্ত ক্রমশ ছোট হচ্ছে। ফিরহাদ, অরূপ, জ্যোতিপ্রিয়— এই নামগুলি শুধুমাত্র কয়েকজন নেতা নন। এঁরা ছিলেন তৃণমূলের সংগঠনের ভিত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার সহযাত্রী। আজ তাঁদের একের পর এক সরে যাওয়া শুধু দলীয় ভাঙনের ইঙ্গিত নয়, বরং নেতৃত্বের প্রতি আস্থার সংকটেরও প্রতিফলন।
একসময় যাঁরা মমতাকে 'সারদা মা'র আসনে বসিয়েছিলেন, যাঁদের রাজনীতির শুরু ও উত্থান হয়েছিল তাঁর হাত ধরে, তাঁরাই আজ নতুন রাজনৈতিক ঠিকানা খুঁজছেন। প্রশ্ন উঠছে, এটা কি শুধুই ক্ষমতার পালাবদলের স্বাভাবিক পরিণতি, নাকি দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র নেতৃত্বের ভিতরে জমে থাকা অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ?
রাজনীতিতে কোনও নেতাই চিরস্থায়ী নন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলায় সমীকরণ, বদলায় আনুগত্যের সংজ্ঞাও। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সম্ভবত বিরোধী শিবির নয়, বরং নিজের দলের ভিতর থেকেই উঠে আসা এই ভাঙনের সুর। আজ তৃণমূলের সামনে প্রশ্ন— দল কি এখনও একজন নেত্রীর চারপাশে আবর্তিত হবে, নাকি নতুন সমীকরণ, এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে এগোবে? আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে প্রশ্ন আরও কঠিন, যাঁদের নিজের মানুষ বলে বিশ্বাস করেছিলেন, তাঁদের হারানোর পরে তিনি কি আবারও নতুন করে নিজের রাজনৈতিক দুর্গ গড়ে তুলতে পারবেন? যদিও সমীকরণ পাল্টে যে ঋতব্রত আগে মমতা ও অভিষেকপন্থী হয়ে উঠেছিলেন, এখন তিনি অভিষেককে চেনেন না।
সময়ের উত্তর এখনও বাকি। তবে এটুকু স্পষ্ট, বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়ে গিয়েছে।