কমিশন কেন বিচারকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টে প্রশ্ন তুললেন বর্ষীয়ান আইনজীবী কপিল সিব্বাল। প্রধান বিচারপতির এজলাস পাল্টা উত্তর দিল, কমিশন দেবে না বাংলায় এসআইআর নিয়ে যখন রাজ্য এবং কমিশন যুদ্ধরত, তখন সুপ্রিম কোর্ট নজিরবিহীনভাবে আদালতের নজরদারিতে বিচারকদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছে। এবং তারপর কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল রাজ্য ও কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। নিম্ন আদালতের বিচারকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে অনেকেই ওটিপির সাহায্যে নিজেদের আইডি লগ ইন করেছেন। কাজও শুরু করে দিয়েছেন। কিন্তু এমতাবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, সুপ্রিম-নির্দেশ অনুযায়ী ২৮ তারিখ কমিশন চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করবে ও তারপর সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশ করবে ঠিকই, কিন্তু নতুন করে কোনও নথি কি আপলোড করা যাবে? তো কে প্রশিক্ষণ দেবে?
এদিন এই বিচারক তথা বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে ভর্ৎসিত হবেন কপিল সিব্বাল।
তাহলে দাঁড়ালটা কী?
বিস্তর কাঠ-খড় পুড়িয়ে শেষ অবধি যা দাঁড়াল, তা হল, চলতি ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখেই চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হচ্ছে। এবং যাঁদের নাম নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, তাঁদের নামের পাশে লেখা থাকছে: UNDER ADJUDICATION, সহজ কথায়, বিবেচনাধীন। এই সংখ্যা মোটের উপর, ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ ! এমতাবস্থায়, বিচারকেরা এই সব নাম-ধাম ও তথ্য-নথি খতিয়ে দেখে যা সিদ্ধান্ত নেবেন, তার উপরই নির্ভর করবে, এই ৬০ লক্ষের মধ্যে কতজন যোগ্য ভোটার হয়ে ভোট দিতে পারবেন।
এদিন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তরে স্পষ্ট জানান, "২৮ তারিখে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হবে। তারপর কোনও সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশিত হবে না। শুনানির পরেও যে-নাম নিয়ে এখনও নিষ্পত্তি হয়নি, সেই সব নামের পাশে লেখা থাকবে: UNDER ADJUDICATION, বিচারকেরা এই ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ জনের মধ্যে যতজনকে যোগ্য ভোটার বলে বিবেচনা করবেন, তাঁরা ভোট দিতে পারবেন। এছাড়াও কিছু নাম বাদ পড়বে। সেইসব নামের পাশে লেখা থাকবে ডিলিটেড। ফর্ম-৭-এ যেসব নাম নিয়ে আপত্তি উঠেছে, তা নিয়েও নিষ্পত্তি হবে। ২৮ তারিখের মধ্যে যাঁদের নাম বাদ যাবে, তাঁদের নামের পাশেই লেখা থাকবে ডিলিটেড। বাকি ৬০ লক্ষ বিবেচনাধীন"।
প্রশ্ন উঠছে, এই রাজ্য থেকে শুরু করে ভিনরাজ্য থেকে বিচারক এনেও এই অর্ধকোটিরও বেশি নামের নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে এত তাড়াতাড়ি? তার আগেই কি ভোট ঘোষণা ও ভোট-পর্বের সমাপ্তি ঘটবে?
সহজ কথায়, শুনানিতে ডাক পাওয়া প্রায় ১ কোটি মানুষের মধ্যে যাঁদের নাম পড়বে, তাঁরা কি দ্বিতীয়বার কোনও নথি আপলোড করার সুযোগ পাবেন? কারণ, বাংলার বাড়ি বা আবাস যোজনার নথির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে কমিশন। ডোমিসাইল সার্টিফিকেট যদি যথাযথ কর্তৃপক্ষ ইস্যু না-করে, তাহলে তা গ্রাহ্য হবে না বলে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকতে চিঠি লিখে জানিয়েছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। এমতাবস্থায়, পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, চূড়ান্ত তালিকাই হোক কি সাপ্লিমেন্টারি তালিকা, যথাযথ নথি না-থাকার কারণে যাঁদের নাম বাদ যাবে, তাঁরা কিন্তু আর বিকল্প কোনও নথি জমা দেওয়ার সুযোগ পাবেন না।
এই পরিস্থিতিতে, মুখ্যমন্ত্রীর সংশয় যথার্থ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। বিচারক তথা বিচারবিভাগীয় আধিকারিকরা কিন্তু নতুন করে কোনও নথি চেয়ে পাঠাবেন না, নতুন করে কোনও শুনানিও করবেন না। তাঁদের কাজ হবে, প্রশ্নচিহ্নের মুখে থাকা ভোটার শুনানির সময়ে কী-কী নথি আপলোড করেছেন ও সংশ্লিষ্ট ভোটারকে গ্রহণ করা বা বাদ দেওয়ার নেপথ্যে রাজ্যের নির্বাচনী আধিকারিকরা কী পর্যবেক্ষণ করেছেন, তার উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেবেন বিচারকরা। এবং সংশ্লিষ্ট ভোটারের নাম রাখা বা না-রাখা প্রসঙ্গে নিজেদের মতামত লিখিত ভাবে জানাবেন ওই সফটওয়ারে।
কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন বিচারকরা?
প্রত্যেক বিচারকের জন্য আলাদা লগইন আইডি তৈরি করা হয়েছে। এক্ষেত্রে কমিশনের পোর্টালে নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে নাম ও ফোন নম্বর দিলে বিচারকদের কাছে ওটিপি আসবে। সেই ওটিপি দিয়ে লগ ইন করতে হবে। লগ ইন করার পর বিচারকের জন্য নির্ধারিত এলাকার (বুথ বা পার্ট) ভোটারদের তথ্য দেখা যাবে।
তারপর?
সূত্রের খবর, স্ক্রিনের বাঁ-দিকে থাকবে সংশ্লিষ্ট ভোটারের এনুমারেশন ফর্ম। এবং তাঁর জমা করা সমস্ত নথি। আর ডান দিকে থাকবে, সংশ্লিষ্ট ভোটার সম্পর্কে বিএলও, এইআরও, ইআরও ও মাইক্রো অবজারভারদের পর্যবেক্ষণ। যাবতীয় নথি ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে বিচারক তখন বিচার করবেন, সংশ্লিষ্ট ভোটারকে তিনি যোগ্য বলে বিবেচিত করছেন কি না। এবং, ওই ভোটারের নামের পাশে টিক-মার্ক দেওয়ার পর, তাঁর নিজস্ব পর্যবেক্ষণও লেখা থাকবে।