সুপ্রিম কোর্টের নজিরবিহীন নির্দেশে বাংলায় এসআইআর পর্ব শেষ হতে চলেছে আদালতের নজরদারিতে। এবং, কে বৈধ ভোটার আর কে অবৈধ তা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন নিম্ন আদালতের বিচারক তথা বিচারবিভাগীয় আধিকারিকরা। এমতাবস্থায়, এদিন কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এক বৈঠকে বসেন। সেখানে উপস্থিত থাকেন রাজ্যের মুখ্য সচিব নন্দিনী চক্রবর্তী ও রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিধারিক মনোজ আগরওয়াল।
কী সিদ্ধান্ত বৈঠকে?
বৈঠক শেষ করে বেরিয়ে আসার পর সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তরে মনোজ আগরওয়াল স্পষ্টই জানান, "আমরা জেলাভিত্তিক ও বিধানসভাভিত্তিক পরিসংখ্যান দিয়ে দেবো। আমরা বলেছি, যে কোনওরকম সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার আমাদের বলেছেন, দিল্লি থেকে কোনও সাহায্য লাগবে কি না তা জানাতে। আমরা চাই, একজনও বৈধ ভোটার যাতে বাদ না-যান। একজনও ভারতীয় ভোটার যেন বাদ না-যান"। লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি বা অন্যান্য কারণে বাদ যাবে কতনাম, ৫০ লক্ষ? উত্তরে তিনি জানান, "না-না, আমরা এমন কিছু বলিনি (রেকমেন্ড করিনি)। এখনও কাজ চলছে। আজ রাত অবধি নিষ্পত্তির কাজ চলবে। রাত বারোটার পর বলতে পারবো, কতজন বাদ যাবে আর কতজন বাদ যাবে না"।
অদ্য শেষ রজনী?
শুনানির পর প্রায় দেড়কোটি মানুষের মধ্যে কতজন বৈধ আর কতজন অবৈধ, তা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা কমিশনের অধীনে কর্মরত রাজ্যের আধিকারিকদের (যদিও এবার সুপ্রিম-রায়ে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করবেন বিচারক ও বিচারবিভাগীয় আধিকারিকরা)। এবং সেই সময়সীমা শেষ হচ্ছে এদিনই, ২১ তারিখ, রাত বারোটার মধ্যে। সূত্রের খবর, এখনও পর্যন্ত সেই নিষ্পত্তির কাজ অনেকাংশেই বাকি রয়েছে। বিরোধী দল বিজেপির দাবি, এসডিও বা বিডিও-রা, যাঁরা রাজ্যের অধীনে কর্মরত এবং এসআইআর পর্বে ইআরও, এইআরও-র দায়িত্বে রয়েছেন, তাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবেই দেরি করছেন। তার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ২১ ফেব্রুয়ারি, একেবারে শেষ রাতে এমন সব নথি দিয়ে বিতর্কিত ভোটারদের নাম আপলোড করা হবে যে, তা পুনর্যাচাই করতে অনেক সময় লেগে যাবে কমিশনের। কারণ, ওই সব নথি কমিশন-স্বীকৃত নয়!
'বাদে'র খাতায় কত?
খসড়া তালিকা প্রকাশ করার সময়ে নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিল: এই তালিকা দেখে নিশ্চিত হওয়ার কিছু নেই, শুনানির জন্য ডাকা হতে পারে অনেককেই। এবং সেই সঙ্গে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছিল, ৩১ লাখ ২৫ হাজার ভোটার আন-ম্যাপড। অর্থাৎ, ২০০২-এর সঙ্গে ২০২৫-এর তালিকা পাশাপাশি ফেলে বেশ কিছু অসংগতি দেখা যাচ্ছে এই সওয়া ৩১ লাখ ভোটারের ক্ষেত্রে। এই অসংগতি নামের বানান নিয়ে হতে পারে। নিকটাত্মীয়ের নামের সঙ্গে মিল-অমিল নিয়েও হতে পারে। মা অথবা বাবার সঙ্গে সন্তানের বয়সের ব্যবধান নিয়ে। মিডিল-নেম থাকা বা না-থাকা নিয়েও। সর্বোপরি, একটি তালিকায় নাম থাকলেও অন্যটিতে নাম না-থাকা নিয়েও হতে পারে।
কমিশনের পরিভাষায় এই অংসগতিকে বলা হচ্ছে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি। এই অসংগতির কারণে অমর্ত্য সেন, জয় গোস্বামী, দেব, কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়, লাবণী সরকার, মহম্মদ শামি-সহ সওয়া ৩১ লাখ ভোটারকে শুনানির নোটিস ধরানো হয়েছে। হাইপ্রোফাইলদের ক্ষেত্রে সেভাবে সমস্যা না-হলেও, লোপ্রোফাইলদের নিদারুন সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে।
এখানেই শেষ নয়। খসড়া প্রকাশের দিন কমিশন জানিয়ে দিয়েছিল, তাদের চোখে ১ কোটিরও বেশি ভোটার 'সন্দেহজনক'। তাঁদের নাম খসড়াতে থাকলেও কমিশন পুনর্যাচাই করে চলেছে। যদিও পুনর্যাচাইয়ের পর অনেক সন্দেহজনক নাম সন্দেহের ঊর্ধ্বে চলে গিয়েছেন। তবু, বাকি রয়েছেন প্রচুর ভোটার। যা প্রায় কোটির কাছাকাছি।
৫৮ + ৫০ = ১ কোটি ৮ লক্ষ বাদ?
খসড়া তালিকায় বাদ গিয়েছিল ৫৮ লক্ষ নাম। কমিশন জানিয়েছিল, কেউ যদি মনে করেন ভুলবশত তাঁর নাম বাদ পড়েছে, তাহলে নিয়মবিধি মেনে তিনি কমিশনের কাছে আবেদন করতে পারেন। এমতাবস্থায়, দু-দফায় শুনানি শুরু হয়। প্রথমে ২০০২-এর তালিকার সঙ্গে ২০২৫-এর তালিকা মিলিয়ে যাঁদের 'ম্যাপ' করা যায়নি, অর্থাৎ, যাঁরা 'আনম্যাপড' থেকে গিয়েছিলেন, তাঁদের একটা অংশ ও 'সন্দেহজনক' বহু ভোটারকে শুনানির জন্য ডেকে পাঠানো হয়। তার কারণ, তাঁদের নামের পাশে 'প্রশ্নচিহ্ন' পড়ে গিয়েছে। এবং, শুনানি-পর্ব শেষের পর কমিশন-সূত্রে জানা যাচ্ছে, যাঁদের ডাকা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে অন্তত ৫০ লক্ষ নাম নিয়ে 'সন্দেহ' রয়েই যাচ্ছে। এবং, এখনও অর্ধকোটিরও বেশি নাম নিয়ে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।
অতঃপর?
কমিশন-সূত্রে জানা যাচ্ছে, শুনানি-পর্বের পর কে বৈধ কে অবৈধ, তা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ইআরও এবং এইআরও। যাঁরা রাজ্যের অধীনে কর্মরত আধিকারিক। এবং মূলত এসডিও আর বিডিও পদমার্যাদার আধিকারিক। ৫০ লক্ষের বেশি নাম নিয়ে তাঁরা কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। তাই, তার নিষ্পত্তিও হয়নি। এমতাবস্থায় পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ২১ ফেব্রুয়ারি রাত বারোটার মধ্যে এই অর্ধকোটি নাম নিয়ে নির্বাচনী আধিকারিকরা সিদ্ধান্ত নিলে, ৭ দিনের মধ্যে ৫০ লক্ষের নাম নিয়ে নিষ্পত্তি করতে পারবে না কমিশন। এবং, 'চূড়ান্ত' সিদ্ধান্ত নিতে হবে বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের।