মণি ভট্টাচার্য: কলকাতা পুরসভার করিডরে বহু বছর ধরে একটি কথা ফিসফিস করে ঘুরে বেড়াত— “কালী না বললে কোনও ফাইল নড়ে না।” এতদিন সেটি ছিল গুঞ্জন, চাপা অভিযোগ, কর্মীদের আড্ডার বিষয়। কিন্তু তারাতলার ভয়াবহ বিপ...
মণি ভট্টাচার্য: কলকাতা পুরসভার করিডরে বহু বছর ধরে একটি কথা ফিসফিস করে ঘুরে বেড়াত— “কালী না বললে কোনও ফাইল নড়ে না।” এতদিন সেটি ছিল গুঞ্জন, চাপা অভিযোগ, কর্মীদের আড্ডার বিষয়। কিন্তু তারাতলার ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর বিধানসভার মেঝেতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যখন প্রকাশ্যে বললেন, “কালীকে তুললেই সব বেরিয়ে যাবে”, তখন সেই ফিসফাস আচমকাই রাজ্যের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হল। প্রশ্নটা শুধু একজন সরকারি আধিকারিক কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে নয়। প্রশ্নটা হল— একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির চেয়েও কি একজন আমলা বেশি ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছিলেন? যদি সত্যিই তাঁর অনুমতি ছাড়া কলকাতা পুরসভার কোনও বড় নির্মাণ পরিকল্পনার অনুমোদন না মিলত, তবে এতদিন সেই ক্ষমতার উৎস কোথায় ছিল? কীভাবে ববি-কালীর দুর্নীতির কালোহাত মিলে-মিশে এক হয়ে গিয়েছিল?
কালীচরণের জীবনপথ নিঃসন্দেহে মেধার গল্প। ডব্লুবিসিএসে দ্বিতীয়, পুলিশ সার্ভিস পরীক্ষায় প্রথম, পরে পুর প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু প্রশাসনিক দক্ষতা আর অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে। একজন সরকারি কর্মচারী যদি এমন অবস্থানে পৌঁছে যান, যেখানে তাঁকে ঘিরেই পুরো দপ্তরের সিদ্ধান্ত আবর্তিত হয়, তাহলে সেটি কোনও ব্যক্তির সাফল্য নয়, বরং প্রশাসনিক কাঠামোর ব্যর্থতা। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, কালীচরণকে ঘিরে বহুদিন ধরেই নানা অভিযোগ ঘুরে বেড়াচ্ছিল। পুরসভার কর্মীদের একাংশের দাবি ছিল, তাঁর অঙ্গুলিহেলন ছাড়া কোনও ফাইল এগোত না। বিরোধীরা বহুবার অভিযোগ তুলেছে, বিল্ডিং প্ল্যান অনুমোদন থেকে বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত— সব ক্ষেত্রেই নাকি ছিল একটি অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ। অথচ সেই অভিযোগগুলির কোনও নিরপেক্ষ তদন্ত হয়নি।
তারাতলার মর্মান্তিক দুর্ঘটনা সেই চাপা প্রশ্নগুলিকে আবার সামনে এনে দিয়েছে। যদি নির্মাণ পরিকল্পনায় ত্রুটি থেকেই থাকে, যদি অনুমোদনের ক্ষেত্রে গাফিলতি হয়ে থাকে, যদি নিয়ম ভেঙে বিপজ্জনক নির্মাণকে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়ে থাকে— তবে দায় কি শুধু ঠিকাদারের? নাকি অনুমোদনের প্রতিটি স্তরও সমানভাবে দায়ী? মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ উঠে এসেছে— ক্যামাক স্ট্রিটের নির্দেশে নাকি কালীচরণের উত্থান এবং তাঁর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন। এই অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। কিন্তু রাজনৈতিক বক্তব্য আর আদালতে প্রমাণ— দু'টি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। তাই এখন প্রয়োজন স্লোগান নয়, নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক তদন্ত। যদি অভিযোগের ভিত্তি থাকে, তবে তা প্রমাণ-সহ আদালতে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আর যদি না থাকে, তবে সেই অভিযোগেরও জবাব দিতে হবে।
কালীচরণ নিজে অবশ্য সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, তিনি জানেন না কেন তাঁকে এই বিতর্কে টানা হচ্ছে। আইনের দৃষ্টিতে তিনিও নির্দোষ, যতক্ষণ না আদালত অন্য কিছু বলছে। সেই নীতিই গণতন্ত্রের ভিত্তি। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। এই ঘটনা আরও বড় একটি বাস্তবতাকে সামনে এনে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কলকাতা পুরসভাকে ঘিরে যে 'দালালতন্ত্র', 'মধ্যস্বত্বভোগী সংস্কৃতি' এবং 'ফাইল-কেন্দ্রিক ক্ষমতার রাজনীতি' নিয়ে অভিযোগ ছিল, তার নিরপেক্ষ অডিট হওয়া জরুরি। কারণ একটি শহরের নিরাপত্তা নির্ভর করে তার প্রশাসনের স্বচ্ছতার উপর। যদি অনুমোদনের প্রতিটি ধাপ প্রশ্নের মুখে পড়ে, তবে আগামী দিনের প্রতিটি বহুতল, প্রতিটি গুদাম, প্রতিটি নির্মাণ নিয়েই মানুষের উদ্বেগ বাড়বে।
তারাতলার ধ্বংসস্তূপ শুধু কয়েকটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি। সেই ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়ে থাকা বহু অজানা প্রশ্নও আজ মাথা তুলেছে। কালীচরণ সেই প্রশ্নগুলির একটি মুখ মাত্র। তদন্তের শেষেই বোঝা যাবে, তিনি কি কেবল একজন প্রশাসনিক আধিকারিক, নাকি এমন একটি ব্যবস্থার প্রতীক, যেখানে নির্বাচিত সরকারের আড়ালে অদৃশ্য ক্ষমতার সমান্তরাল কেন্দ্র তৈরি হয়েছিল।
এখন বাংলার মানুষ উত্তর চায় কালীকে ঘিরে যে রহস্যের কথা বলা হচ্ছে, তা কি সত্যিই উন্মোচিত হবে, নাকি এই বিতর্কও সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক কোলাহলে হারিয়ে যাবে?