মঙ্গলবার বারুইপুরে এসপি অফিসে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, ২০০জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। নাবালিকা-নির্যাতনের ঘটনা সামনে আসার পর যারা প্রকাশ্যে তাণ্ডব করেছিল। এবং, গণপিটুনি দিয়ে এমন এক যুবককে হত্যা করা হয়েছিল, যিনি আদৌ অপরাধী নন। এমতাবস্থায়, তাণ্ডবকারীদের ছেড়ে কথা বলবে না পুলিস।
মুখ্যমন্ত্রীর বিবৃতির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই শুরু হয় ধরপাকড়। পুলিস সূত্রে খবর, প্রথম দফায় ১৮ জন ও দ্বিতীয় দফায় আরও ২২ জনকে আটক করা হয়েছে এখনও পর্যন্ত। পর্যবেক্ষকরা মুখ্যমন্ত্রীর কথা মন্তব্য মনে করিয়ে দিচ্ছেন, যারা ভোটে হেরেছে, অতৃপ্ত আত্মা, তারাই এই গন্ডগোলের মূলে।
প্রসঙ্গত, বুধবার ফরাক্কার কংগ্রেস বিধায়ককে সঙ্গে নিয়ে বারুইপুরে যান অধীর চৌধুরী। বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতার বিস্ময়, “পুলিসের কাছ থেকে বন্দুক কেড়ে নিয়ে গুলি চালাল একজন নেশাখোর! তাহলে কোনও জঙ্গি সংগঠনের কেউ হলে তো আরও বিপদ হত। পুলিসকে তো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তাহলে, কী করে এমন ঘটনা ঘটে”? এরপর তাঁর সংযোজন, “গণপিটুনি খুবই নিন্দনীয়। কিন্তু, সাধারণ মানুষের উপর পুলিসের জুলুম যাতে না-হয়, তা সুনিশ্চিত করতে হবে”।
কংগ্রেসের অধীর চৌধুরী থেকে সিপিআই(এম)-এর সুজন চক্রবর্তীর প্রায় একই। যদিও, নাগরিক সমাজের একটা বড় অংশের প্রশ্ন, রবিবার প্রকাশ্যে যে-তাণ্ডব চলল কয়েকঘণ্টা ধরে, সন্দেহের বশে প্রকাশ্যে পিটিয়ে মারা হল এক যুবককে, তারপরও যদি পুলিস কড়া পদক্ষেপ না-করে, তাহলে এই ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে।
প্রসঙ্গত, বারুইপুরকাণ্ডে অন্যতম অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডল পুলিসের গুলিতে নিহত হয়েছে পরশু রাতে। ধৃত প্রভাসকে নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে অপরাধের পুনঃনির্মাণ করতে যায় পুলিস। দাবি, ওই সময়ে পুলিসের কাছ থেকে বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালায় প্রভাস। পাল্টা পুলিসের গুলিতে নিহত হয় প্রভাস।
ভোটের আলো ফোটার আগেই প্রভাসের মৃত্যুর খবর চাউর হয়ে যায় বারুইপুরে। এবং, ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে প্রভাসের মায়ের প্রতিক্রিয়ায় বিস্মিত হয়ে যায় নাগরিক সমাজ। ছেলের সপক্ষে বলা তো দূর অস্ত, মা সন্ধ্যা মণ্ডল পুলিসকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, প্রভাসের মরদেহ পর্যন্ত দেখতে রাজি নন তিনি।
সংবাদমাধ্যমমে তাঁর প্রতিক্রিয়া, “ও নিজের কর্মফল পেয়েছে। যা করেছে তার ফল পেয়েছে। ভালোই হয়েছে”।
সন্তান-হারানো প্রৌঢ় মায়ের এই প্রতিক্রিয়া সমাজমাধ্যমে আলোড়ন তুলেছে। এবং, কালীগঞ্জ থেকে কামদুনি, সবাই কিন্তু পুলিসের কঠোর পদক্ষেপের পক্ষেও সওয়াল করেছে।
কামদুনিকাণ্ডের প্রতিবাদী মুখ সৌসুমী কয়ালের বক্তব্য, “ধর্ষকের সাজা হয়েছে। এর চেয়ে ভালো কিছু হতে পারে না। বিগত সরকার ১৫ বছর ধরে ধর্ষকদের পাশে দাঁড়িয়েছে। কামদুনি মামলায় দোষীরা খালাস পেয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ধর্ষকদের খরচ করে দেওয়া হবে, ঠিক তা-ই হয়েছে। মন থেকে শান্তি পেলাম। আমরা আশ্বস্ত হলাম। রাজ্যের বুকে ধর্ষকদের আর জায়গা নেই। বাকিদের ৩ জনকেও এনকাউন্টার করে দেওয়া হোক। মেয়েরা যাতে স্বাধীনভাবে চলতে পারে, নতুন একটা বাংলা যেন তৈরি হয়। মুখ্যমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ, ফের কামদুনি ফাইলস খোলা হোক। তদন্ত হোক। দোষীরা উপযুক্ত শাস্তি পাক”।
নদিয়ার কালীগঞ্জে তৃণমূলের বিজয় মিছিল থেকে ছোড়া বোমার আঘাতে মৃত্যু হয় কিশোরী তমান্নার। তমান্নার মা সাবিনা বলেন, “অপরাধীরা এবার ভয় পাবে। অপরাধ করার আগে আর একবার ভেবে দেখবে। আগের সরকার যেভাবে অপরাধীদের পাশে থাকত, তাতে তারা যা ইচ্ছে করে পার পেয়ে যেত। তারা জানত, রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে শেষ অবধি তাদের গায়ে আঁচড়টি পর্যন্ত লাগবে না। এবার, বারুইপুরের এনকাউন্টারে অপরাধীরা অপরাধ করার আগে আর একবার ভেবে দেখবে”।
এমতাবস্থায়, রবিবার যারা তাণ্ডব চালিয়েছিল, যা শেষ অবধি দাঙ্গা-পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, তাদের খাদিরদারি না-করে গ্রেফতারই উপযুক্ত পদক্ষেপ।