এ-দেশের সংসদীয় রাজনীতিতে নজিরবিহীন ভাবে এই প্রথম বিচারবিভাগের নজরদারিতে কোনও রাজ্যে ভোটার তালিকা 'চূড়ান্ত' করা হচ্ছে। এমতাবস্থায়, সুপ্রিম কোর্টের অনুরোধে শনিবারই কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল বৈঠক ডাকেন। এবং সেখানে উপস্থিত থাকেন রাজ্যের মুখ্য সচিব নন্দিনী চক্রবর্তী ও রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল। শীর্ষ আদালতের নির্দেশ ও নির্দেশিকা মেনে ওই বৈঠকে ঠিক হয়, প্রতিটি জেলায় সংশ্লিষ্ট জেলা বিচারক, জেলাশাসক ও পুলিস সুপারকে মাথায় রেখে কমিটি তৈর হয়েছে। লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি বা তথ্যগত অসংগতি-র কারণে যাঁদের নামের পাশে প্রশ্ন চিহ্ন রয়েছে, তাঁরা বৈধ না অবৈধ ভোটার, সেই সিদ্ধান্ত নেবে এই তিনজনের কমিটি। যদিও, সর্বাগ্রে থাকবে জেলা বিচারকের মতামত। এবং, লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির সঙ্গে আনম্যাপড ভোটারদের নিয়েও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে ওই কমিটির বিচারবিভাগীয় আধিকারিকরা।
কী সিদ্ধান্ত বৈঠকে?
শনিবার বৈঠক শেষ করে বেরিয়ে আসার পর সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তরে মনোজ আগরওয়াল স্পষ্টই জানান, "আমরা জেলাভিত্তিক ও বিধানসভাভিত্তিক পরিসংখ্যান দিয়ে দেবো। আমরা বলেছি, যে কোনওরকম সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার আমাদের বলেছেন, দিল্লি থেকে কোনও সাহায্য লাগবে কি না তা জানাতে। আমরা চাই, একজনও বৈধ ভোটার যাতে বাদ না-যান। একজনও ভারতীয় ভোটার যেন বাদ না-যান"। লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি বা অন্যান্য কারণে বাদ যাবে কতনাম, ৫০ লক্ষ? উত্তরে তিনি জানান, "না-না, আমরা এমন কিছু বলিনি (রেকমেন্ড করিনি)। এখনও কাজ চলছে। আজ রাত অবধি নিষ্পত্তির কাজ চলবে। রাত বারোটার পর বলতে পারবো, কতজন বাদ যাবে আর কতজন বাদ যাবে না"।
'বাদে'র খাতায় কত?
খসড়া তালিকা প্রকাশ করার সময়ে নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিল: এই তালিকা দেখে নিশ্চিত হওয়ার কিছু নেই, শুনানির জন্য ডাকা হতে পারে অনেককেই। এবং সেই সঙ্গে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছিল, ৩১ লাখ ২৫ হাজার ভোটার আন-ম্যাপড। অর্থাৎ, ২০০২-এর সঙ্গে ২০২৫-এর তালিকা পাশাপাশি ফেলে বেশ কিছু অসংগতি দেখা যাচ্ছে এই সওয়া ৩১ লাখ ভোটারের ক্ষেত্রে। এই অসংগতি নামের বানান নিয়ে হতে পারে। নিকটাত্মীয়ের নামের সঙ্গে মিল-অমিল নিয়েও হতে পারে। মা অথবা বাবার সঙ্গে সন্তানের বয়সের ব্যবধান নিয়ে। মিডিল-নেম থাকা বা না-থাকা নিয়েও। সর্বোপরি, একটি তালিকায় নাম থাকলেও অন্যটিতে নাম না-থাকা নিয়েও হতে পারে।
কমিশনের পরিভাষায় এই অংসগতিকে বলা হচ্ছে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি। এই অসংগতির কারণে অমর্ত্য সেন, জয় গোস্বামী, দেব, কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়, লাবণী সরকার, মহম্মদ শামি-সহ সওয়া ৩১ লাখ ভোটারকে শুনানির নোটিস ধরানো হয়েছে। হাইপ্রোফাইলদের ক্ষেত্রে সেভাবে সমস্যা না-হলেও, লোপ্রোফাইলদের নিদারুন সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে।
এখানেই শেষ নয়। খসড়া প্রকাশের দিন কমিশন জানিয়ে দিয়েছিল, তাদের চোখে ১ কোটিরও বেশি ভোটার 'সন্দেহজনক'। তাঁদের নাম খসড়াতে থাকলেও কমিশন পুনর্যাচাই করে চলেছে। যদিও পুনর্যাচাইয়ের পর অনেক সন্দেহজনক নাম সন্দেহের ঊর্ধ্বে চলে গিয়েছেন। তবু, বাকি রয়েছেন প্রচুর ভোটার। যা প্রায় কোটির কাছাকাছি।
৫৮ + ৫০ = ১ কোটি ৮ লক্ষ বাদ?
খসড়া তালিকায় বাদ গিয়েছিল ৫৮ লক্ষ নাম। কমিশন জানিয়েছিল, কেউ যদি মনে করেন ভুলবশত তাঁর নাম বাদ পড়েছে, তাহলে নিয়মবিধি মেনে তিনি কমিশনের কাছে আবেদন করতে পারেন। এমতাবস্থায়, দু-দফায় শুনানি শুরু হয়। প্রথমে ২০০২-এর তালিকার সঙ্গে ২০২৫-এর তালিকা মিলিয়ে যাঁদের 'ম্যাপ' করা যায়নি, অর্থাৎ, যাঁরা 'আনম্যাপড' থেকে গিয়েছিলেন, তাঁদের একটা অংশ ও 'সন্দেহজনক' বহু ভোটারকে শুনানির জন্য ডেকে পাঠানো হয়। তার কারণ, তাঁদের নামের পাশে 'প্রশ্নচিহ্ন' পড়ে গিয়েছে। এবং, শুনানি-পর্ব শেষের পর কমিশন-সূত্রে জানা যাচ্ছে, যাঁদের ডাকা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে অন্তত ৫০ লক্ষ নাম নিয়ে 'সন্দেহ' রয়েই যাচ্ছে। এবং, এখনও অর্ধকোটিরও বেশি নাম নিয়ে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।
কমিশনসূত্রে খবর, কমবেশি দেড়কোটি ভোটারের কতজন চূড়ান্ত তালিকায় থাকবে বা থাকবে না, তা নিয়ে তারা তাদের মতো রিপোর্ট দেবে। এবং, আদালতের গড়ে দেওয়া কমিটি তা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।