২০১১ সালে পরিবর্তনের প্রবল হাওয়া ক্ষমতায় এনেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। ১৫ বছর পর ফের বাংলায় পরিবর্তনের হাওয়া প্রবল হয়েছে ঠিকই। কিন্তু, সেই হাওয়ার অভিমুখ দেখে দু-দফার ভোটের পরও পর্যবেক্ষকরা বুক ঠুকে কেউ বলতে পারছেন না যে, তৃণমূল হারছে ও বিজেপি জিতছে।
কেন?
পর্যবেক্ষকরা এক একটা চমৎকার ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। ২০২১-তে তৃণমূল ক্ষমতায় আসবে কি না, সেই পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য বিধানসভা ভোট শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়নি। কারণ, সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে জমি আন্দোলনের যে-এপিসেন্টার তৈরি হয়েছিল, তা কলকাতার রাজপথকেও কম্পিত করেছিল। এবং, ২০০৯-এর লোকসভা ভোটে সিপিআই(এম)-কে কার্যত অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়ে রেকর্ড আসনে জয়ী হয়েছিল তৃণমূল। এমতাবস্থায়, ২০১১-এ বাংলার পালাবদলের পূর্বাভাস দিতে বুথ-ফেরত সমীক্ষার উপর নির্ভর করতে হয়নি রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের।
মমতার 'অ্যাডভান্টেজ'
১, সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে যে-পদ্ধতিতে জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছিল, নাগরিক সমাজের একটা বড় অংশই তা কিন্তু ভালো চোখে দেখেনি। এমনকি, সিঙ্গুরে কৃষক আন্দোলন ও টাটাদের ন্যানো কারখানা তৈরির মধ্যে দ্বিতীয়টাকেই বেছে নিয়েছিলেন যাঁরা প্রথমে, তাঁরাও কিন্তু একটা পর্যায়ের পর বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সরকারের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। অধিগ্রহণ পর্বে একটি বাড়ির ছাদে উঠে পুলিসের বেধড়ক লাঠিচার্জ রীতিমতো নাড়া দেয় নাগরিক বিবেককে। ইতিমধ্যেই নন্দীগ্রামেও জমি আন্দোলনের মাটি তৈরি হয়। এবং, অবরুদ্ধ-নন্দীগ্রামে অবরোধ ভেঙে ঢুকে পড়ে বিশাল পুলিসবাহিনী। বাকিটা ইতিহাস।
২. একদিকে নাগরিক সমাজ, অন্যদিকে অতিবাম দল ও সংগঠন, জমি আন্দোলনে সবাই তখন এককাট্টা। এমতাবস্থায়, বামফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করার ক্ষমতা রাখেন একমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতা তখন ক্রাউড পুলার। সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, নেতাই, লালগড়, সর্বত্র ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রবল হয়ে উঠছে এবং সেইসঙ্গে তৃণমূল সুপ্রিমোর পালে হাওয়া বইছে। যদিও, সিপিএমের বাইরে যাঁরা বামমনস্ক ছিলেন বা বামঘরানার রাজনীতি করতেন, তাঁদের কেউ কেউ কিন্তু ভিন্ন অবস্থান নিয়েছিলেন: সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলবে কিন্তু তাই বলে তৃণমূলকে ক্ষমতায় আনার দাবি করে পরিবর্তন চাই স্লোগান দেওয়া অনর্থক।
৩ তবুও। পাল্লা ভারি তখন মমতার দিকেই। অপর্ণা সেন থেকে শুরু করে কৌশিক সেন, শাঁওলি মিত্র, শুভাপ্রসন্ন, সুজাত ভদ্র, সুনন্দ সান্যাল, কবীর সুমন, পল্লব কীর্তনিয়া, সবাই তখন মমতার পাশে (যদিও তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর সুনন্দ সান্যাল ও পল্পব কীর্তনিয়া প্রতিবাদ শুরু করেন ও একঘরে হয়ে যান)। সাংবাদিকদের মধ্যেও তখন অঘোষিত মমতা-শিবির তৈরি হয়।
৪. ক্ষমতায় আসার প্রশ্নে মমতার সবচেয়ে বড় অ্যাডভান্টেজ ছিল, তিনি এবং তাঁর সতীর্থরা কেউ কোনও দুর্নীতি ও কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েননি। কারণ, সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের মতো বর্ষীয়ান নেতা ছাড়া আর প্রায় কেউই সেভাবে কোনও মন্ত্রিসভায় ছিলেন না। সহজ কথায়, দুর্নীতির কালি লাগেনি কারুর সাদা পোশাকে। অতএব, বামেদের একমাত্র বিকল্প হয়ে উঠতে সময় লাগেনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের।
বিজেপির 'অ্যাডভান্টেজ'
১. প্রবলভাবে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে ফের। বাংলায়। ১৫ বছর পর। এবং, শাসক তৃণমূলের প্রধান বিরোধী হিসেবে উঠে এসেছে বিজেপি। এবং, বাংলায় শাসক ও বিরোধীর সৌজন্যে নজিরবিহীন মেরুকরণের রাজনীতি শুরু হয়েছে। এমতাবস্থায়, বিজেপির অ্যাডভান্টেজ অবশ্যই পরিবর্তনের পক্ষে বইতে থাকা হাওয়া এবং সরকার-বিরোধী জনমত। যে-ই ক্ষমতায় আসুক না-আসুক, তৃণমূলকে সরাতে হবে, এটাই এখন বাংলার নাগরিক সমাজের মনের কথা।
২. কিন্তু...। এর মধ্যে এমন একটা 'কিন্তু' রয়ে গেছে, যা ২০১১-তে ছিল না। বাংলার বুদ্ধিজীবী মহল কিন্তু বিজেপির সঙ্গে নেই। এমনকি, লেখক, কবি, শিল্পীদের মধ্যে যাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রবল সমালোচক, তাঁরাও কিন্তু বিজেপিকে সমর্থন করছেন না। এর ব্যতিক্রম একবারে হাতে গোনা।
৩. মমতা যেমন অতিবাম দল বা সংগঠনের সমর্থন পেয়েছিলেন, বিজেপি কিন্ত তা পাচ্ছে না। অতিবামেরা অনেকেই এখন সমানভাবে তৃণমূল ও বিজেপির বিরুদ্ধে। এসআইআর ইস্যুতে পথে নেমেছে এপিডিআর-এর মতো মানবাধিকার সংগঠন।
৪. বিরোধী ভোট ভাগ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না ২০১১ সালে। এবং, যে-সম্ভাবনা এখন কিন্তু রয়েছে। প্রসঙ্গত, সিপিএম-কে হারাতে 'একের বিরুদ্ধে এক' প্রার্থী দেওয়ার পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে সওয়াল করে গেছেন সুনন্দ সান্যালের মতো স্বচ্ছ ভাবমূর্তির শিক্ষাবিদ। এবং, অবশেষে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট হয়েছে তৃণমূলের। এবং, কংগ্রেস-তৃণমূল জোটের সৌজন্যেই সিপিএমের বিরুদ্ধে ভোট ভাগ হয়নি। বিজেপির কিন্তু এই অ্যাডভান্টেজ নেই সেভাবে। একদা কট্টর সিপিএম-বিরোধীরাও অনেকে এখন চাইছেন, ফেরাতে হাল ফিরুক লাল। মাঠে-ময়দানের বাম ছাত্রযুবদের উপস্থিতি নজর কাড়ছে। অন্যদিকে, মালদহ ও মুর্শিদাবাদে কংগ্রেসের পুনরুত্থান ঘটছে। এমতাবস্থায়, তৃণমূল-বিরোধী ভোট সবটাই যে বিজেপির পক্ষে যাবে, তা বুক ঠুকে বলতে পারছে না গেরুয়া শিবির। বরং, সেই ভয যে গেরুয়া নেতৃত্বকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে, তা বোঝা যাচ্ছে তাদের কথায়: সিপিএম-কে ভোট দিয়ে ভোট নষ্ট করবেন না।
৫. তবে বিজেপির সবচেয়ে বড় অ্যাডভান্টেজ হল, নির্বাচন কমিশনের সৌজন্যে ভোটার তালিকা থেকে ভুয়ো-মৃত ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। এবং, বাংলায় 'ভোটের কালচার' পাল্টেছে। কমিশনের অতি বড় সমালোচকও স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন যে, নাহ্, এবার ভোটে জল মেশেনি।
৬. অনুপ্রবেশ ইস্যুকে যেভাবে চ্যাম্পিয়ন করা চেষ্টা চালিয়ে এসেছেন নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহরা, সেই কাজে তাঁরা অনেকটাই সফল। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, অনুপ্রবেশ বা সংখ্যালঘু তোষণের মতো ইস্যু কিন্তু বাংলার একটা বড় সংখ্যক ভোটারকে প্রভাবিত করেছে। এবং, হিন্দুভোট সংহত করতে সাহায্য করেছে। যা অবশ্যই বিজেপির বড় অ্যাডভান্টেজ।
৭. ২০১১-তে পালাবদলের সময়ে মুখ্যমন্ত্রী হয়ে উঠেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তখনও পর্যন্ত তাঁর সততা অনেকের কাছেই প্রশ্নাতীত ছিল। বিজেপি কিন্তু তেমন কোনও মুখকে সামনে তুলে ধরতে পারেনি। বাংলাভাষী কেউ মুখ্যমন্ত্রী হবেন বলে অমিত শাহ ইঙ্গিত দিয়েছেন ঠিকই। তবে, ইঙ্গিতে কতটা চিঁড়ে ভিজবে, তা বলা কঠিন।
তাহলে?
সোমবার অবধি, আর ৪৮ ঘণ্টা, অপেক্ষা করা। ব্যস।