'ওসি কালীঘাট'। কলকাতা পুলিসের অভ্যন্তরীণ সমীকরণে গত দেড়দশক ধৎে এই পদ অতি প্রভাবশালী। তা যেমন ধারে কাটে, তেমনই ভারে কাটে। আর কাটবে না-ই-বা কেন। যে-থানার ওসি শান্তনু সিনহা বিশ্বাস, যে-থানার...
'ওসি কালীঘাট'। কলকাতা পুলিসের অভ্যন্তরীণ সমীকরণে গত দেড়দশক ধৎে এই পদ অতি প্রভাবশালী। তা যেমন ধারে কাটে, তেমনই ভারে কাটে। আর কাটবে না-ই-বা কেন। যে-থানার ওসি শান্তনু সিনহা বিশ্বাস, যে-থানার এক্তিয়ারভুক্ত এলাকায় অন্যতম দুই বাসিন্দার নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, সেই থানার ওসি যে অতি-প্রভাবশালী হবেন, তা বলাই বাহুল্য।
কালের সংক্ষিপ্ত নিয়মে কালে-কালে শান্তনুর পদোন্নতি হয়েছে। কিছুটা বিতর্কিত ভাবেই কলকাতা পুলিসের ডিসি পদ অলঙ্কৃত করেছেন তিনি। তারপর, সোনা পাপ্পু থেকে শুরু করে সোনার ছেলেদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বা প্রভাব খাটিয়ে বাড়ি খালি করিয়ে প্রোমোটারিতে সহায়তার মতো গুরুপাক অভিযোগে গুরুতরভাবে বিদ্ধ তিনি।
অধুনা শান্তনু আর কালীঘাট থানার ওসি নেই ঠিকই। কিন্তু তাতে কী? 'দ্য কিং ইজ ডেড, লং লিভ দ্য কিং' ( 'The king is dead, long live the king')! রাজতন্ত্রই হোক কি সাধারণতন্ত্র, ক্ষমতার মৃত্যু নেই। ক্ষমতা বহমান। একেবারে চেয়ার-টেবিল-সহ বহমান। নইলে কি ওসি-কালীঘাটের অধুনা সংস্করণ নিজের চেয়ারে বসে স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র ধরে নিজের ছবি পোস্ট করেন সমাজমাধ্যমে!
যেহেতু নির্বাচনের আগে কমিশন কলকাতা পুলিসের বহু থানায় ওসি পরিবর্তন করেছিল এবং তার মধ্যে কালীঘাট থানাও ছিল, তাই এক্ষেত্রে অবশ্য গল্প ঘুরে গিয়েছে। এই পোস্ট দেখিয়ে এবার তৃণমূল কমিশনের কাছে অভিযোগ জানিয়ে বলছে, নির্দিষ্ট করে কোনও ব্যক্তি টার্গেট করার ইঙ্গিত রয়েছে এই ছবিতে। অভিযোগ পেয়ে পদক্ষেপ করতে কালক্ষেপ করেনি কমিশন। সাসপেন্ড করা হয়েছে কলকাতা পুলিসের ওই আধিকারিককে।
কিন্তু এখানেই এই অধ্যায় সমাপ্ত হচ্ছে না।
এই সাসপেনশন ঘিরে রগড়প্রিয় বাঙালি ইতিমধ্যেই রগড় করতে শুরু করে দিয়েছে। তারা বলছে, উত্তরপ্রদেশ থেকে বাংলায় এসে 'সিংহম' অজয়পাল দাপট দেখাবেন আর কলকাতার পুলিস ছবি পোস্ট করে 'সিংহম' হওয়ার সুপ্ত বাসনাটুকু প্রকাশ চাইলেই গেল-গেল রব, এ কেমনতর কথা? তাছাড়া স্থানমাহাত্ম্যে তো কালীঘাট কোনও অংশে পিছিয়ে নেই। এই কালীঘাটের আদিগঙ্গা দিয়ে নাকি একদা চলে গিয়েছে চাঁদ বণিকের নৌকা। টলি সাহেব এসে গঙ্গা থেকে একটি নালাপথ বের করে টালিনালা তৈরি করেছেন। মা-কালীর অধিষ্ঠানে কালীঘাট যেমন শাক্তদের পীঠস্থান হয়ে উঠেছে, পরবর্তী কালে তেমনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বসতবাড়িও কালীঘাটকে সর্বভারতীয় রাজনীতির পীঠস্থান করে তুলেছে। অটলবিহারী থেকে বনবিহারী কে না-এসেছেন সেখানে! পরবর্তী প্রজন্মে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আলোতেই আলোকিত হচ্ছে কালীঘাট। এখন কথা হল, এমন একটি সর্বধর্মীয় সর্বশক্তিমান পীঠস্থান রয়েছে যেখানে, সেই কালীঘাটের ওসি বন্দুক হাতে পোজ দিলে দোষটা কোথায়?
যদিও, সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, এভাবে নাকি সরকারি পদে বসে বন্দুক হাতে ছবি তুলে পোস্ট দেওয়া রীতিবিরুদ্ধ। কিন্তু তাতে কী এসে যায়। গত ৫-১০ বছর ধরে বাংলায় যা ঘটছে, তার সবটাই তো রীতি-বিরুদ্ধ তথা রীতির প্রতিকূলে বহমান। হাইকোর্টের বিচারপতি তাঁর এজলাস থেকে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকে ঢিলেমির জন্য তিরস্কার করে সরাসরি হাসপাতালে গিয়ে 'কালীঘাটের কাকু'র কণ্ঠস্বরের নমুনা আনতে পাঠাচ্ছেন এবং সন্ধে গড়িয়ে রাত অবধি নিজের চেম্বারে অপেক্ষা করছেন! আবার, হাইকোর্টে কর্মরত বিচারপতি টিভি চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিয়ে মহা-বিতর্ক তৈরি করছেন এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ওই বিচারপতির বিচার করছেন! রাজ্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার অভাবে সুপ্রিম কোর্ট ভোটারদের ভাগ্য নির্ধারণের দায়িত্ব তুলে দিচ্ছেন বিচারবিভাগের হাতে এবং সেই সঙ্গে মন্তব্য করছে, বাংলায় 'অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে অস্বাভাবিক নির্দেশ'!
মধু কবি সেই কবে লিখে গিয়েছিলেন, 'অলীক, কুনাট্য রঙ্গে, মজে লোক রাঢ়ে-বঙ্গে'।