তিনি লড়তে জানেন। তিনি গড়তেও জানেন। এবং, উন্নয়নের কাজ করে তার খতিয়ান দিয়ে দলের প্রতিপক্ষ শিবিরকে বিঁধতেও পারেন।
'তিনি' কাজল শেখ।
বোলপুরের নিচুপট্টির বাড়ি থেকে সিবিআই যেদিন অনুব্রত মণ্ডলকে আটক করে নিয়ে গেল, সেদিন থেকেই বীরভূমে শাসক শিবিররের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ বদলে যায়। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন ও মনে করাচ্ছেন, পরেরবছর জেলায় পঞ্চায়েত নির্বাচনে রক্ত ঝরেনি, খুনোখুনি হয়নি। এমনকি, অনুব্রত-জমানার রেওয়াজ অনুযায়ী, মনোনয়ন জমা দিতে গিয়ে শাসকদলের ত্রাস-হুমকি, গুলি-বোমা, কোনও কিছুর মুখে যাতে না-পড়তে হয় বিরোধীদের, তা সুনিশ্চিত করতে তৃণমূল নেতৃত্ব সর্বশক্তি নিয়ে পথে নামে। রীতিমতো চোঙাফুঁকে ঘাসফুল নেতারা বিরোধীদের মনোয়ন জমা দিতে অনুরোধ করেন। অহিংস পঞ্চায়েত নির্বাচনে একদিকে তৃণমূল জয়ী হয় আর অন্যদিকে 'বিরোধী-শূন্য'-র বদনামও ঘোচে। এবং, জেলা পরিষদের সভাধিপতি হন কাজল শেখ। রাজনৈতিক ভাবে যিনি ঘাসফুলে থেকেও অনুব্রত মণ্ডলের চির প্রতিদ্বন্দ্বী।
তেইশের পঞ্চায়েত নির্বাচনের পর চব্বিশের লোকসভাতেও কিন্তু বীরভূম মোটের উপর শান্ত ছিল। হানাহানি, বোমাবাজি, রক্তপাত ও রক্তচক্ষু ছাড়াই সুষ্ঠুভাবে ভোট হয়েছিল। এরপর, জামিন পেয়ে তিহার থেকে বোলপুরে ফিরে অনুব্রত মণ্ডল দেখলেন, তাঁর সাজানো বাগান শুকিয়ে গিয়েছে। এবং, পাশেই ফুল ফুটে শোভাবর্ধন করছে কাজল শেখের বাগান।
বীরভূমে রক্তপাতহীন ভোট করিয়ে জেলাপরিষদের সভাধিপতি হয়েছেন দলে অনুব্রতর অন্যতম এই প্রতিদ্বন্দ্বী। এমতাবস্থায়, ২০২৫-এ, পুজোর পর দলের বিজয়া সম্মিলনীকে ঘিরে অনুব্রত-গোষ্ঠী বনাম কাজল-গোষ্ঠীর রেষারেষি, বোমাবাজি শুরু হয়। অনুব্রত-গোষ্ঠী ক্রমশ কোণঠাসা হতে থাকে। ধীরে-ধীরে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে সুর চড়াতে শুরু করেন অনুব্রত। এবং একইসঙ্গে দলের অভ্যন্তরে কাজল শেখের কাজ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন অনুব্রত-ঘনিষ্ঠরা। ছাব্বিশের বিধানসভা যখন দরজায় কড়া নাড়ছে, তখন, কাজলের নেতৃত্বে বীরভূম জেলা পরিষদ উন্নয়নের কাজ কতটা কী করেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় দলের ভিতর। এবং প্রকারান্তরে বলা হয়, সেভাবে কোনও কাজই করা হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে, মাঠে নামেন জেলা পরিষদের সভাধিপতি কাজল শেখ। এদিন জেলা পরিষদের কর্মাধ্যক্ষদের সঙ্গে নিয়ে একটি প্যামফ্লেট প্রকাশ করেন তিনি। যেখানে, আড়াই-তিনবছরে কোথায় কতটা কী উন্নয়নের কাজ হয়েছে, বিস্তারিতভাবে তার বর্ণনা দেওয়া হয়। দলের অভ্যন্তরে প্রতিপক্ষ শিবিরকে উপযুক্ত জবাব দিয়ে কাজল শেখ এদিন সংবাদমাধ্যমের সামনে মন্তব্য করেন, "এই ধরনের বিষয়ে যাঁদের কোনও ধারণা নেই, তাঁরা বলছেন, বীরভূম জেলা পরিষদ সঠিকভাবে কাজ করেনি, সঠিকভাবে উন্নয়ন করেনি। তাই সংবাদমাধ্যমের সামনে, জনপ্রতিনিধিদের পাশে নিয়ে বলতে চাই, বীরভূম জেলা পরিষদ কোন-কোন গ্রামে, কোন-কোন জায়গায়, কী-কী কাজ করেছে। এই কয়েকবছরে জেলা পরিষদ কতটা এগিয়ে গিয়েছে, তা স্পষ্ট বোঝা যাবে (এই প্যামফ্লেট থেকে) "।
জেলার প্রতিটি ব্লকে এই প্যামফ্লেট পাঠানো হবে বলে দাবি করেন দৃশ্যতই আত্মবিশ্বাসী কাজল শেখ। এবং, দলে তাঁর হেভিওয়েট প্রতিপক্ষের উদ্দেশে বার্তা, "জেলা পরিষদের উন্নয়ন হয়নি বলেছিলেন যাঁরা, তাঁরা কিছু না-জেনেই বলেছিলেন"।