বাংলার ভোট ভবিষ্যত আবর্তিত হয় মূলত পাহাড় আর জঙ্গল ঘিরে। এই দুই জায়গার রাজনীতির সমীকরণ বাকি জায়গার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। স্বাধীনতার পর থেকে এই দুই অঞ্চলের মানুষের প্রধান দাবী, জীবনযাত্রার উন্নয়ন।
এককালে মাওবাদীদের চারণ ভূমি পুরুলিয়ার প্রধান ইস্যু অনুন্নয়ন। ছবির মত এই জেলায় রাত নামলেই সজাগ হত ইনসাসের নল। যদিও পরিস্থিতি এখন বদলেছে অনেকটাই।
শাল পিয়াল পলাশ মহুল দিয়ে ঢাকা জঙ্গল মহলের এলাকা। ছবির মত সাজানো অযোধ্যা রেঞ্জ, অসংখ্য পাহাড়ি ঝরনা। পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমতম জেলা পুুরুলিয়ার উত্তরে রয়েছে বর্ধমান এবং ঝাড়খন্ডের ধানবাদ। পূর্বে বাঁকুড়া ও পশ্চিম মেদিনীপুর, দক্ষিণে ঝাড়খন্ডের পশ্চিম ও পূর্ব সিংভূম এবং পশ্চিমে ঝাড়খণ্ডের বোকারো, রামগড় ও রাঁচি জেলা। পুরুলিয়া ছোটনাগপুর মালভূমির একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত অঞ্চল। জেলার সিংহভাগ জঙ্গলে ঘেরা।
রয়েছে অযোধ্যা পাহাড় রিজার্ভ ফরেস্ট,মাথা ফরেস্ট , কুইলাপাল জঙ্গল, বান্দোয়ান ফরেস্ট ,দুয়ারসিনি জঙ্গল ,বারন্তি জঙ্গল । একটা সময় জেলার বান্দোয়ান, বরাবাজার, বাঘমুণ্ডি, বোরো থানার আঁকরো বড়কদম এলাকা মাওবাদীদের জন্য কুখ্যাত ছিল। পুরুলিয়া জেলায় মোট ৯ টি বিধানসভা কেন্দ্র রয়েছে। বান্দোয়ান, বলরামপুর, বাঘমুণ্ডি, জয়পুর, পুরুলিয়া, মানবাজার, কাশীপুর, পাড়া, রঘুনাথপুর।
জঙ্গলমহল বেশ কয়েক দশক ধরে প্রতিষ্ঠান বিরোধী। বাম আমলে জঙ্গলমহল ছিল বর্তমান শাসকদলের তুরুপের তাস। এখন কোন অবস্থায় পুরুলিয়া? বিগত দুটো বিধানসভা এবং লোকসভার ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে।
বান্দোয়ান
২০১৬ সালের নির্বাচনে বান্দোয়ান কেন্দ্র থেকে জিতেছিলেন তৃণমূলের রাজীবলোচন সোরেন। ২০২১ সালেও জয় পেয়েছিলেন তৃণমূলের রাজীবলোচন সোরেন। তবে সিপিএম কে সরিয়ে বিজেপি উঠে এসেছে দ্বিতীয় স্থানে।
বলরামপুর
২০১৬ সালের নির্বাচনে জিতেছিলেন তৃণমূলের শান্তিরাম মাহাতো। ২০২১ সালে শান্তিরাম মাহাতো কে হারিয়ে উঠে এলেন বিজেপির বনেশ্বর মাহাতো। কংগ্রেস দ্বিতীয় স্থান হারায় এখানে।
বাঘমুণ্ডি
বাঘমুণ্ডি কেন্দ্র থেকে ২০১৬ র নির্বাচনে জয়ী হন জাতীয় কংগ্রেসের নেপাল মাহাতো । ২০২১ এর নির্বাচনে এই বিধানসভা ক্ষেত্রে ওড়ে তৃণমূলের পতাকা। জয়ী হন সুশান্ত মাহাতো।
জয়পুর
২০১৬ সালে জয়পুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূলের শক্তিপদ মাহাতো। ২০২১ সালে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। এই কেন্দ্রে ওড়ে বিজেপির পতাকা। জয়ী হন বিজেপির নরহরি মাহাতো।
পুরুলিয়া
পুরুলিয়া বিধানসভা কেন্দ্রে জয় পেয়েছিলেন কংগ্রেসের সুদীপ মুখোপাধ্যায়। সুদীপ মুখোপাধ্যায় এরপরে বিজেপিতে যোগ দেন। এবং ২০২১ সালে বিজেপির পতাকায় লড়েন এবং জয় পান এই কেন্দ্র থেকে।
মানবাজার
মানবাজার কেন্দ্র থেকে ২০১৬ সালে জিতেছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সন্ধ্যারাণী টুডু। ২০২১ সালেও তৃণমূলের হয়ে লড়ে জয় লাভ করেন তিনি।
কাশীপুর
২০১৬ সালে এই কেন্দ্র থেকে জয় লাভ করেন তৃণমূলের স্বপনকুমার বেলথারিয়া। ২০২১ সালে স্বপন কুমার বেলথারিয়াকে হারিয়ে জয় পান বিজেপির কমলাকান্ত হাঁসদা।
পাড়া
পাড়া বিধানসভায় ২০১৬ সালে জয় পেয়েছিলেন তৃণমূলের উমাপদ বাউরি ২০২১ সালে এই বিধানসভা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয় শাসক দল। ২০২১ সালে এই কেন্দ্র থেক জয় পান বিজেপির নাদিয়ার চাঁদ বাউরি।
রঘুনাথপুর
রঘুনাথপুর কেন্দ্র থেকে ২০১৬ সালে জয় পান তৃণমূলের পূর্ণচন্দ্র বাউরি। ২০২১ সালে এই কেন্দ্র থেকে জেতেন বিজেপির বিবেকানন্দ বাউরি
বিধানসভা ভোট বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে ২০১৬ সালে পুরুলিয়ার ৯ টি বিধানসভার সাতটি ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে দুটি ছিল জাতীয় কংগ্রসের দখলে। ২০২১ সালে পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে যায়। এই জেলায় নিজেদের চারটি বিধানসভার আসন হারায় তৃণমূল। কংগ্রেসও নিজেদের আসন ধরে রাখতে পারে না। অন্যদিকে বিজেপি ২০২১ সালে এই জেলার ৬ টি আসন জিতে নেয়।
এতো গেল বিধানসভার হিসেব নিকেষ এক নজরে দেখে নেওয়া যাক গত দুটি লোকসভা নির্বাচনে কেমন ছিল পুরুলিয়ার পরিস্থিতি।
পুরুলিয়া জেলায় একটি পূর্ণাঙ্গ লোকসভা কেন্দ্র রয়েছে। পুরুলিয়া লোকসভা কেন্দ্রে ২০১৯ সালে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন বিজেপির জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো। ২০২৪ সালেও বিজেপির জ্যোতির্ময় মাহাতোর ওপর ভরসা রেখেছেন পুরুলিয়ার মানুষ।
কেমন আছেন পুরুলিয়ার মানুষ? শাসকদলে ভরসা রাখতে পারছেন? নাকি পরিবর্তনের হিসেব করছেন? কোথায় কোথায় সমস্যা হয়েছে? কোথায় কোথায় উন্নয়নের জোয়ার এসেছে? কোন কোন ইস্যুর ওপর নির্ভর করে ভোট হবে এবার পুরুলিয়ায়?
২০২৬ এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আবহে পুরুলিয়ার ভোট ইস্যু মূলত উন্নয়ন, নাগরিক পরিষেবা এবং স্থানীয় আবেগ। গোটা জেলায় কেন্দ্র-রাজ্যের দড়ি টানাটানি চলছে। গ্রাম পঞ্চায়েত এবং শহর সংলগ্ন এলাকায় প্রশাসনের বিরুদ্ধে উন্নয়নের অভাব নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে। ভোটার তালিকায় 'বিবেচনাধীন' ভোটারদের নাম বাদ যাওয়া নিয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ করেছে, বিজেপির মদতে বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। তৃণমূলের একাধিক ভাতা, এলাকায় একটি সহানুভূতির আবহাওয়া তৈরি করছে। উল্টো দিকে বিজেপি একশ দিনের কাজ এবং প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার দুর্নীতি তুলে ধরছে। পুরুলিয়া জেলা জঙ্গলমহলের অন্তর্গত হওয়ায় কুড়মি জনজাতির ভোট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় কর্মসংস্থানের অভাবে প্রতি বছর হাজার হাজার যুবক ভিন রাজ্যে কাজ করতে বাধ্য হন। এটা একটি বড় ইস্যু বটে। পানীয় জলের সংকটও এই জেলার বড় সংকট। কৃষকরা অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি সাহায্য ও বিমা প্রকল্পের সুবিধা ভোগ করতে পারেন না। এছাড়া নগর এলাকায় পৌর পরিষেবার অভাব তো রয়েছেই।
ক্ষোভ রয়েছে। সন্তুষ্টি রয়েছে। রয়েছে একাধিক প্রশ্ন। সবকিছু মিলিয়ে পুরুলিয়ার মানুষ এবার কোন দিকে তাদের আস্থা রাখবেন তা অবশ্য সময় বলবে।