এটা বিশ্বাস করা হয় যে মৌনী অমাবস্যায় গঙ্গা নদীর জল অমৃতে পরিণত হয়। মৌন (নিরবতা) ব্রত মৌনী অমাবস্যায় পালন করা হয়। আভ্যন্তরীণ শব্দ এবং বাহ্যিক শব্দে নীরবতা যোগের একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ।
মহাকাব্য মহাভারত অনুসারে, মনু মহান জ্ঞানে সমৃদ্ধ ছিলেন। তাকে মানব জাতির পূর্বপুরুষ হওয়ার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল এবং তার বংশধরদের এইভাবে মানুষ বলা হয়। তিনি মানবধর্ম শাস্ত্র , বা মনুর আইন, মনু-স্মৃতি নামে আরও ভালভাবে পরিচিত , একটি গ্রন্থ যা ধর্মীয় ও সামাজিক নিয়মাবলী রচনা করে বলে মনে করা হয়। মৌনি নীরবতা এবং অমাবস্যাকে বোঝায় , অমাবস্যার প্রথম দিনকে বোঝায়। পৌরাণিক মতাদর্শে এই দিনটি , যখন আদিম দম্পতি, মনু এবং তার স্ত্রী শতরূপা পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিল। অনেকে মনুকে মহারাজা বা মহান রাজা হিসেবে উল্লেখ করেন আবার কেউ কেউ তাকে ঋষি হিসেবে উল্লেখ করেন।
পুরাণ অনুযায়ী মৌনি অমাবস্যায় মনু ঋষির জন্ম হয় এবং এদিন থেকেই শুরু দ্বাপর যুগের। এদিন নিঃশব্দে থাকার বিধান রয়েছে হিন্দুধর্মে। উপবাস রেখে এদিন নিঃশব্দে স্নান সারতে হয়। তারপর ধ্যানে বসে থাকেন পূণ্যার্থীরা। এদিন নৈঃশব্দ্য পালন করে দান-ধ্যান করলে পূণ্যলাভ হয় বলে প্রচলিত বিশ্বাস। শাস্ত্র মতে এই দিন সমস্ত নদী-সহ গঙ্গার জল বিশেষ পবিত্র হয়ে ওঠে ৷ এদিন নদীর জল অমৃতসম হয়ে ওঠে বলে বিশ্বাস ৷ অশ্বমেধ যজ্ঞ করলে যে পরিমাণ পুণ্য হত এদিন নদীতে স্নান করলে সেই পুণ্য অর্জন হয় ৷ যদি নদীতে বা তীর্থ স্থানে গিয়ে স্নান করা না সম্ভব হয় তাহলে বাড়িতে স্নান করে ধর্মাচরণের মধ্যে দিয়ে দিনটি অতিবাহিত করা উচিত ৷
দিনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল নীরবতার ব্রত,বা মৌন-ব্রত । নীরবতা একজনকে নিজের নিজের সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম করে। বাহ্যিক নীরবতা একটি অভ্যন্তরীণ নীরবতার দিকে পরিচালিত করে, আত্ম-সচেতনতা বা স্বাধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক । মানুষ চিন্তা করার সময় পায় না। নীরবতা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় আত্মদর্শনের জন্য এই ঘর তৈরি করে এবং নিজের চিন্তাভাবনা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করে। যদিও আমরা সবাই জানি যে নীরবতা সুবর্ণ, আমরা অনেকেই এটি অনুশীলন করি না। এই দিনটি, একজনকে প্রতিফলিত করতে এবং আত্মদর্শন করতে এবং একটি কোলাহলপূর্ণ বিশ্বে হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তির সন্ধান করতে সক্ষম করে।
মৌনি অমাবস্যাকে অনেকে দর্শা অমাবস্যাও বলে থাকেন। মাঘ মাসের এই অমাবস্যা তিথি অত্যন্ত পবিত্র বলে বিবেচিত। এদিন পৃথিবীতে নেমে এসে ঈশ্বর তাঁর রূপ পরিবর্তন করেন বলে প্রচলিত বিশ্বাস। এদিন নৈঃশব্দ্য পালন করলে মানসিক শান্তি পাওয়া যায় এবং রোগমুক্তি ঘটে বলে অনেকে বিশ্বাস করেন। যদি মৌনব্রত না ধারণ করা যায় তাহলে অন্ততপক্ষে মুখ দিয়ে খারাপ শব্দ বা কটু কথা বলবেন না ৷ এই দিনে তিল, তেল,কম্বল, কাপড় আর ধনের দান করলে প্রচুর পুণ্য হয় ৷ যাঁদের রাশিতে শনির প্রভাব বেশি তারা এই দিনে দানধ্যান করলে লাভবান হন৷
*এদিন নিঃশব্দে থাকার বিধান রয়েছে হিন্দুধর্মে। উপবাস রেখে এদিন নিঃশব্দে স্নান সারতে হয় ও পুজো অর্চণা করতে হয়।
* এদিন দেরি করে ঘুম থেকে উঠবেন না। মৌনি অমাবস্যায় যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঘুম থেকে উঠে কাউকে কিছু না বলে জলে কালো তিল ফেলে স্নান করুন৷ এরপর সূর্য প্রণা সেরে নেওয়া জরুরি৷ স্নান সেরে সূর্যপ্রণাম সারা পর্যন্ত চেষ্টা করুন এদিন কোনও কথা না বলতে।
* মৌনি অমাবস্যার রাতে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা উচিত নয় বলে অনেকে মনে করেন ৷ পাশাপাশি এও মনে করা হয় যে এই মিলনে যে সন্তান সৃষ্টি হয় তাকে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়৷
* এদিন কোনও কলহ বিবাদে জড়িয়ে যাবেন না৷ অন্যথা হলে পূর্বপুরুষদের আশীর্বাদ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন ৷ পারলে তাঁদের উদ্দেশ্যে দান ধ্যান করতে পারেন এদিন ৷
মাঘ মাসে কৃষ্ণপক্ষের অমাবস্যাকে মৌনি অমাবস্যা বলা হয়।দান-ধ্যান ও পূণ্যস্নানের জন্য এই মাস হিন্দুধর্মে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। মাঘ মাসের অমাবস্যাই মৌনি অমাবস্যা হিসেবে পরিচিত।