শেখা মোজা বিন্ত নাসের আল-মিসনাদ কাতারের রাজপরিবারের অন্যতম পরিচিত মুখ। মধ্যপ্রাচ্যের রক্ষণশীল সমাজে তাঁর জীবনযাপন ও পোশাকের ধরন বরাবরই থাকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। বহুমানুষের কৌতূহলের বিষয়ের পাশাপাশি তিনি আন্তর্জাতিক ফ্যাশন দুনিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত একটি নাম। তবে শুধু পোশাক-আশাক নয়, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং সমাজকল্যাণমূলক নানা উদ্যোগের সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে তাঁর পরিচয়। মোজা হলেন কাতারের প্রয়াত আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির দ্বিতীয় স্ত্রী। বর্তমানে কাতারের আমির হলেন তাঁদের সন্তান তামিম বিন হামাদ আল থানি। সেই সূত্রে মোজা দেশের বর্তমান শাসকের মাতা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে তাঁকে অনেক সময় ‘কাতার প্রিন্সেস’ হিসেবেও উল্লেখ করে। রাজপরিবারের সদস্য হয়েও নিজের ভিন্ন পরিচিতি তৈরি করেছেন মোজা।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি সর্বদা নজর কাড়ে। পরিপাটি সাজ, মাথার আবরণ, গয়না এবং পোশাকের অভিনব সমন্বয় তাঁর নিজস্ব স্টাইল স্টেটমেন্ট। বিশ্বের নামী ফ্যাশন সংস্থাগুলিও তাঁকে সামনে রেখে তৈরী করছে পোশাক। নিজেদের তৈরী ফ্যাশন জায়গা পাচ্ছে রাজরানীর শরীরে। ভ্যালেন্টিনো, ক্রিশ্চিয়ান ডিয়র, শ্যানেল, আরমানি, এলি সাব, গুচি, ভার্সাচে এবং জিভঁশির মতো বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের পোশাক তাঁর সংগ্রহে রয়েছে বলে শোনা যায়। তবে কাতারের সামাজিক রীতিনীতি মেনে পোশাকের ক্ষেত্রে বেশ কিছু পরিবর্তন করান মোজা। পশ্চিমি ডিজাইনের কোনও পোশাক পছন্দ হলে সেটিকে কাতারি পরিবেশের উপযোগী করে দেওয়া হয় তাঁর জন্য। যেমন খোলামেলা গলার জায়গা বদল করে করা হয় উঁচু গলার নকশা। ছোট ঝুলের পোশাক তৈরি হয় গোড়ালি পর্যন্ত দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে। হাতকাটা পোশাকেও যোগ করা হয় লম্বা হাতা। ফলে আন্তর্জাতিক ফ্যাশনের সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতিরও দীর্ঘ মেলবন্ধন ঘটে। তাঁর পোশাক ও গয়নার সংগ্রহের আর্থিক মূল্য নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। একবার ভ্যালেন্টিনো সংস্থা কাতারের মালিকানা রাজপরিবার-সমর্থিত অনুরূপ সংস্থার হাতে যাওয়ার পর মোজাকে নিয়ে রসিকতা ছুঁড়ে দিয়েছিলেন তাঁর স্বামী। দীর্ঘদিন ভ্যালেন্টিনোর পেছনে তাঁর বিপুল খরচের কথা উল্লেখ করে তিনি জানিয়েছিলেন, সংস্থাটি কিনে নেওয়ার পর যেন সেই খরচের তুলনায় দাম যেন খানিক কমই পড়েছে। ভ্যালেন্টিনো অধিগ্রহণে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়।
তবে মোজার পরিচিতি কেবল বিলাসী জীবন বা ফ্যাশনেই সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর উদ্যোগ আন্তর্জাতিক স্তরে বিপুল প্রশংসিত হয়েছে। কাতারে গড়ে ওঠা ‘এডুকেশন সিটি’ তাঁর অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এক জায়গায় এনে সেখানে উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। তরুণদের কর্মসংস্থান, চিকিৎসা পরিষেবা এবং গবেষণার ক্ষেত্রেও তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। তাঁর উদ্যোগে কাতারে চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণার পরিকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। শিশু ও মহিলাদের জন্য বিশেষ চিকিৎসা পরিষেবার ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হয়েছে। তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে বিভিন্ন প্রকল্পও হাতে নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা ও সমাজকল্যাণে দীর্ঘদিনের কাজের জন্য আন্তর্জাতিক মহলেও সম্মান পেয়েছেন মহারানী। ফিলানথ্রপি বা জনকল্যাণমূলক কাজের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষ আলোচিত। রাষ্ট্রপুঞ্জের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চেও তাঁকে বক্তব্য রাখার জন্য বিভিন্ন সময় আমন্ত্রণ জানিয়েছে। ফলে শেখা মোজার পরিচয় শুধু কাতারের রাজপরিবারের সদস্য হিসেবেই আর সীমাবদ্ধ নয়, একদিকে আন্তর্জাতিক ফ্যাশনের পরিচিত মুখ, অন্যদিকে শিক্ষা ও সমাজকল্যাণের উদ্যোগী ব্যক্তিত্ব; দুই ভূমিকাতেই নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করেছেন তিনি।