Calcutta Television Network

মহাকালের ক্যানভাসে বেনারস:যেখানে জীবন মৃত্যু একাকার

মহাকালের ক্যানভাসে বেনারস:যেখানে জীবন মৃত্যু একাকার

10 August 2026 , 04:27:56 pm

"শিব ঠাকুরের আপন দেশে,আইন কানুন সর্বনেশে", বেনারস,শিব ঠাকুরের আপন দেশ। মহাকালের ত্রিশূলের ডগায় যে শহর দাঁড়িয়ে আছে হাজার বছর ধরে। ভারত বর্ষের প্রাচীন জনপদের একটি,বারানসী বা বেনারস,শুধুই একটি শহর না,একটি অনুভূতি,উদলব্ধি। মার্ক টোয়েন,তাঁর Following the Equator: A Journey Around the World-বইতে বলেছিলেন, "Benares is older than history, older than tradition, older even than legend, and looks twice as old as all of them put together." I ইতিহাসের চেয়েও পুরানো,ঐতিহ্যের চেয়েও পুরানো এ শহর যেমন জীবনকে নতুন দর্শন দেয়,তেমনি মৃত্যুকে উদযাপন করে প্রতিদিন। এই শহরের অলি-গলিতে, শতাব্দী প্রাচীন ভাঙা মন্দিরের দেওয়ালে,আর যুগ যুগ ধরে বয়ে চলা গঙ্গার স্রোতে জীবন-মৃত্যু পাশাপাশি ঘর করে। মৃত্যু দিয়ে আমাদের জীবনের যখন শেষ হয়,এই শহরে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়,মোক্ষ। শিব নিজের তৈরী এই জনপদ,ইহলোক ও পরলোকের মাঝে এক অলৌকিক সেতু। 

ভোর ৫টা,গঙ্গার বুক থেকে তখন সূর্যদেব উদিত হচ্ছে । 'সুবহে-বেনারস'-এর প্রথম আলো যখন গঙ্গার বুকে এসে পরে, তখন মন্ত্রোচ্চারণ, শাঁখের আওয়াজ আর আরতির ঘণ্টাধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে দশদিক। দশাশ্বমেধ ঘাটে সাধু-সন্ন্যাসীদের শিবনাম জপ,পুণ্যার্থীদের ভক্তির ডুব, আর ভোরের পাখির ডানার শব্দে শুরু হয় নতুন জীবনের উৎসব। ঘাটের সিঁড়িতে বসে কেউ জীবনের নতুন গল্প বুনে চলেছেন,কেউ আবার দূর দেশ থেকে এসে এই শহরের প্রাচীন সংস্কৃতির স্বাদ নিচ্ছেন। বেনারসি শাড়ির সুতোর টান,অলি-গলিতে  গরম কচুরি-জিলিপির সুবাস আর চায়ের মাটির ভাঁড়ের ঠুংঠাং শব্দে জীবন এখানে তার পূর্ণ রূপ নিয়ে চঞ্চল,সজীব এবং চরম বর্ণময়।

কিন্তু এই আলো আর কোলাহলের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে মণিকর্ণিকা বা হরিশচন্দ্র ঘাট,যেখানে জীবনের অন্য পিঠের নির্মম সত্যটি প্রতিদিন হাজার বার উদযাপিত হয়। সেখানে চিতার আগুন কখনো নেভে না,দিন কিংবা রাত, চব্বিশ ঘণ্টাই আগুনের লেলিহান শিখা আকাশ ছুঁতে চায় এবং কাঠের চটচট শব্দে পুড়তে  থাকে এক একটি পার্থিব শরীর। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও বেনারস কিন্তু কোনোদিন শোকগ্রস্ত হয় না। এখানে মৃত্যু কোনো কান্নার বা ভয়ের বিষয় নয়, বরং তা এক পরম আনন্দ, এক পরম মুক্তি,‘মহানিৰ্বাণ’। বিশ্বাস করা হয়, কাশীর মাটিতে প্রাণত্যাগ করলে স্বয়ং মহাদেব কানে তারকব্রহ্ম নাম শুনিয়ে জীবকে মোক্ষ দান করেন। তাই তো বহু মানুষ জীবনের শেষ দিনগুলো কাটানোর জন্য দূর-দূরান্ত থেকে এসে এই শহরের 'মুক্তি ভবনে' আশ্রয় নেন। তারা মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করেন, কোনও এক অদ্ভুত শান্তিতে,বিষাদ ছাড়া। একপাশে যখন নতুন জীবনের আবাহন চলছে, তার কয়েক পা দূরেই তখন আরেকটি পার্থিব শরীর পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। একই গঙ্গাজলে কেউ সূর্যপ্রণাম করছেন, আবার সেই জলেই বিসর্জিত হচ্ছে চিতার ভস্ম। চিতার ধোঁয়া, চন্দনের কাঠ আর ধূপের গন্ধ বাতাসে মিশে এক অদ্ভুত বৈরাগ্য, যা মানুষকে এক লহমায় জাগতিক মোহ থেকে মুক্ত করে দেয়। কাশীর বিশ্বনাথ মন্দিরের ধ্বনি আর মণিকর্ণিকার নিস্তব্ধতা—দুই-ই এখানে এক সুরে বাঁধা।

দার্শনিক দৃষ্টিতে দেখলে, বেনারস কোনো ভৌগোলিক ভূখণ্ড নয়, এটি আসলে মানুষের অন্তরাত্মার এক পরম আয়না। গঙ্গার অবিরত বয়ে চলা যেন মহাকালের সেই অনন্ত ধারা,যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে অহংকার, প্রাপ্তি আর লৌকিক সম্পর্কের মায়া আসলে কতটা ক্ষণস্থায়ী। এই শহরে এসে জীবনের কোলাহল আর মৃত্যুর নিস্তব্ধতা এক বিন্দুতে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। মণিকর্ণিকার চিতার আলো এখানে অন্ধকারের প্রতীক নয়, বরং তা মোহভঙ্গের এক পরম আলো, যা মানুষকে শেখায় যে জীর্ণ বস্ত্র ত্যাগের মতোই আত্মা তার পুরনো শরীর ত্যাগ করে মাত্র। ঘাটের সিঁড়িতে বসে যখন কেউ গঙ্গার বুকে ভেসে যাওয়া প্রদীপগুলোর দিকে তাকায়, তখন সে বোঝে যে জীবন এবং মৃত্যু আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একই মুদ্রার দুটি পিঠ। বেনারস আমাদের শেখায় কোনো বিদায়ই চিরতরে হারিয়ে যাওয়া নয়, বরং তা অহংবোধ ধুয়ে-মুছে ব্রহ্মাণ্ডের অনন্ত শূন্যতায় নিজেকে সঁপে দেওয়া। আরতির প্রদীপের শিখা আর চিতার আগুন—দুই-ই এখানে মহাকালের বুকে জ্বলে ওঠা সমান পবিত্র দুই জ্যোতি, যা জীবকে শেষ পর্যন্ত এক পরম ও অখণ্ড শান্তিতে বিলীন করে দেয়।

0 0 0

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে আপনি কোন দলকে সমর্থন করেন?

Note:"আপনার তথ্যের গোপনীয়তা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি বিশ্লেষণধর্মী কথোপকথন এবং এখানে কোনো ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ বা প্রকাশ করা হবে না"
×
  • CTVN