Calcutta Television Network

যোগ ও ঋষি পতঞ্জলি: অন্তহীন আলোর সন্ধান

যোগ ও ঋষি পতঞ্জলি: অন্তহীন আলোর সন্ধান

14 August 2026 , 05:34:05 pm

আধুনিক জীবনের ব্যস্ত ও মানসিক চাপে জর্জরিত জীবনে 'যোগ' বা 'যোগব্যায়াম' কেবল শরীরচর্চার মাধ্যম নয়, বরং মন ও আত্মার শান্তিকে খুঁজে নেওয়ার পথ হয়ে উঠেছে। আজ বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ সুস্থতার জন্য যোগাভ্যাস করছেন। কিন্তু এই চিরন্তন জীবন দর্শনের ভিত্তি যিনি স্থাপন করেছিলেন, তিনি হলেন প্রাচীন ভারতের মহান মনীষী ঋষি পতঞ্জলি। তাঁর হাত ধরেই বিক্ষিপ্ত অবস্থায় থাকা প্রাচীন যোগতত্ত্ব একটি সুনির্দিষ্ট, বিজ্ঞানসম্মত এবং সুশৃঙ্খল দর্শনের রূপ পেয়েছিল। যোগ এবং ঋষি পতঞ্জলির অবদান তাই মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক অমূল্য অধ্যায়। ঋষি পতঞ্জলিকে মনে করা হয় সনাতন যোগ দর্শনের জনক। তাঁর জন্মকাল বা সঠিক জীবন ইতিহাস নিয়ে নানা মতভেদ থাকলেও, গবেষকদের মতে তিনি খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় বা চতুর্থ শতকের অব্দে এই ধারাকে লিপিবদ্ধ করেছিলেন। ভারতীয় ঐতিহ্যে তাঁকে শেষনাগের অবতার হিসেবেও কল্পনা করা হয়, যা প্রতীকী অর্থে অন্তহীন জ্ঞান ও চেতনার প্রতীক। 

মহর্ষি পতঞ্জলির সবচেয়ে বড় অবদান হলো তাঁর রচিত 'যোগসূত্র'। এর আগে যোগের ধারণা বেদ, উপনিষদ ও পুরাণে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। তাঁর  সেই আধ্যাত্মিক ও মানসিক সাধনাকে একত্রিত করে মাত্র ১৯৬টি সূত্রের মাধ্যমে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করেন। তাঁর এই অমর গ্রন্থটি মনস্তত্ত্ব, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং আধ্যাত্মিক মুক্তির এক অনন্য গাইডবুক। পতঞ্জলির যোগ দর্শনের মূল ভিত্তি হলো 'অষ্টাঙ্গ যোগ'। অষ্টাঙ্গ কথার অর্থ আটটি অঙ্গ বা ধাপ। তিনি মানব মনকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এনে পরমাত্মার সাথে যুক্ত করার জন্য একটি আট ধাপের বৈজ্ঞানিক পথ বাতলে দিয়েছেন। এর প্রথম দুটি ধাপ হলো 'যম' (সামাজিক নৈতিকতা ও অহিংসা) এবং 'নিয়ম' (ব্যক্তিগত শৃঙ্খলা ও পবিত্রতা)। অর্থাৎ, একজন মানুষকে যোগী হতে হলে আগে ভেতর ও বাইরে থেকে শুদ্ধ হতে হবে। তৃতীয় ধাপটি হলো 'আসন', যা আজ সারা বিশ্বে শারীরিক কসরত হিসেবে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। পতঞ্জলির মতে, আসন হলো এমন এক শারীরিক অবস্থা যা দীর্ঘ সময় স্থির ও সুখদায়ক থাকে। চতুর্থ ধাপ 'প্রাণায়াম' বা শ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রণ, যা শরীরের শক্তি প্রবাহকে সচল রাখে। অষ্টাঙ্গ যোগের পরের ধাপগুলো মূলত অন্তর্মুখী সাধনার। পঞ্চম ধাপ 'প্রতাহার' হলো ইন্দ্রিয়গুলোকে বাইরের জগত থেকে গুটিয়ে নেওয়া। ষষ্ঠ ধাপ 'ধারণা' বা কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে মনকে স্থির করা। সপ্তম ধাপ 'ধ্যান', যেখানে মন দীর্ঘ সময় ধরে সেই বিষয়ে নিমগ্ন থাকে। আর সর্বশেষ ও সর্বোচ্চ ধাপ হলো 'সমাধি', যেখানে সাধক নিজের অহংবোধ হারিয়ে পরম চেতনার সাথে একাত্ম হয়ে যান এবং পরম শান্তি বা মোক্ষ লাভ করেন। সাধন পাদে উপস্থাপিত যোগের অষ্টাঙ্গ, মনকে বশে আনা এবং অহংকে অতিক্রম করার একটি সুস্পষ্ট পথ দেখায়। যদিও উন্নত সাধনার মাধ্যমে বিশেষ শক্তি বা অন্তর্দৃষ্টি ( সিদ্ধি ) লাভ হতে পারে, কিন্তু যোগের প্রকৃত লক্ষ্যের তুলনায় এগুলো গৌণ। পতঞ্জলি জোর দিয়ে বলেন যে, অহংকে অতিক্রম করে এবং সকল কিছুর সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করার মাধ্যমেই মুক্তি আসে। কৈবল্য পাদে পতঞ্জলি ব্যাখ্যা করেছেন যে যোগের চূড়ান্ত লক্ষ্য হল কৈবল্য-আধ্যাত্মিক মুক্তি ও মোক্ষ। অষ্টাঙ্গ অনুশীলনের মাধ্যমে সাধক মানসিক বাধা ও বিক্ষিপ্ততা অতিক্রম করে অবশেষে শান্তি, একত্ব ও সমাধির এক অবস্থায় পৌঁছান, যেখানে সাধক অসীমের সাথে বিলীন হয়ে আধ্যাত্মিক মুক্তি লাভ করেন। ঋষি পতঞ্জলি, যোগের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, "যোগশ্চিত্তবৃত্তিানিরোধঃ"—যার অর্থ, মনের ভেতরের অস্থিরতা বা বৃত্তির সম্পূর্ণ নিরোধ বা নিয়ন্ত্রণই হলো যোগ। 

আজকের একবিংশ শতাব্দীতে এসেও ঋষি পতঞ্জলির এই দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা একটুও কমেনি, বরং বহুগুণ বেড়েছে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞান স্বীকার করেছে যে, নিয়মিত যোগাভ্যাস ও প্রাণায়াম মানুষের মানসিক চাপ (Stress), বিষণ্ণতা (Depression) ও উদ্বেগ দূর করতে অনন্য ভূমিকা পালন করে। এটি কেবল শরীরের নমনীয়তাই বাড়ায় না, বরং মানুষের মনকে শান্ত ও কর্মক্ষম রাখে। বিশ্বমঞ্চে যোগের এই গুরুত্বকে স্বীকৃতি দিয়েই প্রতি বছর ২১শে জুন 'আন্তর্জাতিক যোগ দিবস' পালিত হয়। আর এই সমস্ত কিছুর মূলে রয়েছে ঋষি পতঞ্জলির সেই হাজার বছর আগের দূরদর্শী চিন্তা। তিনি মানবজাতিকে শিখিয়ে গেছেন যে, প্রকৃত সুখ বাইরের বস্তুতে নয়, বরং নিজের মনের ভেতরের শৃঙ্খলা ও আত্মোপলব্ধির মধ্যেই লুকিয়ে আছে।

0 0 0

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে আপনি কোন দলকে সমর্থন করেন?

Note:"আপনার তথ্যের গোপনীয়তা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি বিশ্লেষণধর্মী কথোপকথন এবং এখানে কোনো ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ বা প্রকাশ করা হবে না"
×
  • CTVN