আঁধার রাতে কালোরূপে আলো ফোটে । তিনি আদি, তিনি অন্ত। তিনি একদিকে সৃষ্টিসুখের উল্লাস, অন্যদিকে মহাপ্রলয়ের মহাশূন্যতা। বাঙালি মানসে দেবী কালী একাধারে স্নেহময়ী জননী এবং সংহাররূপী ভীষণা। কিন্তু এই ভয়ংকর সুন্দর রূপের আড়ালে কী গভীর দর্শন লুকিয়ে আছে? কেনই বা তান্ত্রিক ও দার্শনিকেরা তাঁর রূপের মধ্যে খুঁজে পান পরম ব্রহ্মের ‘শূন্যতা’? আজ আমরা ডুব দেব কালীর রূপ ও শূন্যতার সেই আদিম রহস্যে।
কৃষ্ণবর্ণের রহস্য: যেখানে হারিয়ে যায় সব রঙ। কালী শব্দটির উৎপত্তি ‘কাল’ থেকে, যার অর্থ সময় । দেবী কৃষ্ণবর্ণা কেন? বিজ্ঞান বলে, কালো কোনও রঙ নয়, বরং সব রঙের অনুপস্থিতি অথবা সব রঙের শোষণ। দর্শনও ঠিক এই কথাই বলে। মহাবিশ্বের সৃষ্টির আগে চারদিকে কেবল অন্ধকার ছিল। সেই আদিম অন্ধকারই হলেন কালী, যেখানে থমকে গেছে সময়। যেমন সমুদ্রের জল দূর থেকে নীল বা কালো দেখায়, কিন্তু হাতে নিলে তা বর্ণহীন, ঠিক তেমনই মায়াবদ্ধ মানুষের চোখে তিনি কৃষ্ণা। সমস্ত নাম, রূপ, গুণ এবং অহংকার যখন চিতার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়, তখন যা অবশিষ্ট থাকে—তা হলো মহাশূন্যতা। সেই শূন্যতারই প্রতীক দেবীর এই কালো রূপ।
আলুলায়িত কেশ ও নগ্নিকা রূপ: আবরণহীন পরম সত্য। মা কালীর মূর্তিতে কোনো রাজকীয় বস্ত্র বা অলঙ্কার থাকে না। তিনি দিগম্বরী বা নগ্ন। এই নগ্নতা কোনো লৌকিক বিষয় নয়, এটি হলো ‘আবরণহীন সত্যের’ প্রতীক।
মুক্তকেশী: তাঁর আলুলায়িত বা খোলা চুল প্রকৃতির মুক্ত ও বাঁধনহারা রূপকে প্রকাশ করে। তিনি কোনো নিয়মের শিকলে আবদ্ধ নন।
দিগম্বরী: মায়া বা বিভ্রমের যে আবরণ মানুষকে সত্য দেখতে বাধা দেয়, মা কালী সেই আবরণ থেকে মুক্ত। তিনি দিক্-বসনা, অর্থাৎ দশ দিক্সমূহ তাঁর বস্ত্র। পরম ব্রহ্ম কখনো বস্ত্রে ঢাকা পড়তে পারে না, কারণ তিনি অসীম।
মুণ্ডমালার দর্শন : অহংকারের বিসর্জনদেবীর গলায় পঞ্চাশটি নরমুণ্ডের মালা। আপাতদৃষ্টিতে এটি ভয়ংকর মনে হলেও, এর পেছনে রয়েছে ভাষার গভীর তত্ত্ব। সনাতন ধর্মে এই পঞ্চাশটি মুণ্ড হলো সংস্কৃতির পঞ্চাশটি মাতৃকা বর্ণ বা ‘অক্ষর’। সৃষ্টি ও শব্দের এই উৎসকে দেবী নিজের গলায় ধারণ করে আছেন।
অন্যদিকে, তাঁর কোমরে ঝুলে থাকা কাটা হাতের কাঞ্চী বা মেখলা মানুষের ‘কর্মের’ প্রতীক। মানুষ যা কিছু করে, তা ঈশ্বরের চরণে সমর্পিত হওয়া উচিত। দেবীর হাতের খড়্গ কাটে মানুষের ভেতরের ‘অহংকার’ ও ‘পশুবৃত্তি’। যখন অহংকার কেটে যায়, তখনই মানুষ নিজের ভেতরের পরম শূন্যতা বা ব্রহ্মের স্বাদ পায়।
শিবের বুকে কালীর পা : চেতনা ও শক্তির মেলবন্ধনকালী মূর্তির সবচেয়ে বড় রহস্য লুকিয়ে আছে শিবের ওপর তাঁর দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিমায়। শিব এখানে শবাকারে (মৃতদেহের মতো) শায়িত। শিব হলেন ‘শুদ্ধ চেতনা’ বা ‘পুরুষ’—যিনি নিষ্ক্রিয়। আর কালী হলেন ‘আদি শক্তি’ বা ‘প্রকৃতি’—যিনি পরম সক্রিয়।
চেতনা ছাড়া শক্তি যেমন উন্মাদ ও ধ্বংসাত্মক, শক্তি ছাড়া চেতনাও তেমন স্থবির ও মৃতপ্রায়। শিবের বুকে পা দিয়ে কালী যখন নিজের সংহাররূপ বুঝতে পারেন, তখন লজ্জায় তিনি জিব কাটেন। এই জিব কাটা কেবল লজ্জার প্রকাশ নয়, এটি হলো রাজসিক শক্তিকে (রক্তিম জিব) সাত্ত্বিক দন্ত (সাদা দাঁত) দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করার চিরন্তন দর্শন।
লয় থেকে শূন্যতায় ফেরা : তন্ত্র সাধনায় কালী হলেন ‘মহাশূন্য’। সাধক যখন ধ্যানমগ্ন হন, তখন তিনি নিজের অস্তিত্বকে দেবীর কালোরূপে বিলীন করে দেন। সৃষ্টির শেষ বিন্দু যেখানে এসে থামে, আধ্যাত্মিকতার ভাষায় সেটাই শূন্যতা। কালী সেই শূন্যতারই জীবন্ত রূপক। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, এই পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল, রূপ, আর অহংকার একদিন শান্ত হবে সেই অনন্ত আঁধারে, যেখানে কেবল বিরাজ করবেন মা—মহাকালের মহাকালী।